বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্রমবর্ধমান সংকট। প্রায় এক যুগ ধরে চলমান এ সংকট সাম্প্রতিক সময়ে আরও তীব্র হয়েছে। শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি স্টেশন থেকে শুরু করে আবাসিক খাত—সবখানেই গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব পড়ছে। সরকার এলএনজি আমদানি, নতুন কূপ খনন এবং অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নিলেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের জোগান ও প্রাপ্তি নিয়ে আকাশ সমান প্রত্যাশা থাকলেও প্রাপ্তি খুবই সামান্য। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বিদ্যমান অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্র পরিণত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ফলে প্রতিবছরই প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদন কমছে। নতুন কূপ খনন করে কিছু গ্যাস পাওয়া গেলেও তা উৎপাদন হ্রাসের প্রবণতা পূরণ করতে পারছে না।
পেট্রোবাংলার বিভিন্ন সময়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের বড় অংশ এখন ব্যয়বহুল আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলেই দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের সরবরাহের বিপরীতে চাহিদা অনেক বেশি। ফলে শিল্পাঞ্চলে কম চাপ, নতুন সংযোগ বন্ধ, অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়ছে। চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোনোভাবেই জোগান নিশ্চিত করতে পারেনি অতীতের সরকার। বর্তমান সরকারের অবস্থাও সেই একই ধারাবাহিকতার মধ্যেই পড়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে দেশে মোট ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আবিষ্কৃত গ্যাসের মোট পরিমাণ প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ)-এর কাছাকাছি বলে বিভিন্ন সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ২০ টিসিএফেরও বেশি গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বিভিন্ন সময়ে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে নতুন বড় কোনো আবিষ্কার না হলে আগামী বছরগুলোতে দেশীয় উৎপাদন আরও কমতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘অবশিষ্ট মজুদ’ এবং ‘সম্ভাব্য সম্পদ’ এক বিষয় নয়। বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র, পার্বত্যাঞ্চল এবং অনাবিষ্কৃত স্থলভাগে এখনও উল্লেখযোগ্য গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে; কিন্তু অনুসন্ধানের গতি দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় ধীর ছিল। ফলে সেসব খনিজসম্পদ হিসেবে ধরা হচ্ছে না। তাদের মতে, পার্বত্যাঞ্চল, গভীর সমুদ্র এবং যেসব এলাকায় অনুসন্ধান করা হয়নি, সেসব জায়গার কোথাও একটি বড় গ্যাসের রিজার্ভ যদি মিলে যায়, তবে বাংলাদেশ এক সংকট থেকে বাঁচতে পারে। তা না হলে হয়তো পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে যেতে পারে দেশ।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস সংকটের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ হলোÑ পুরনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া, দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না হওয়া, নতুন বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে ব্যর্থতা, শিল্পায়নের কারণে গ্যাসের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর এলএনজি নির্ভরতা বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আরও অনেক আগে থেকে দেশে অনাবিষ্কৃত এলাকাগুলোতে জোরালো অনুসন্ধান চালানো দরকার ছিল। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকা দরকার ছিল সমুদ্রে গ্যাসের অনুসন্ধান করা। গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানি শুরু করে। এর মাধ্যমে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও এটি ব্যয়বহুল জ্বালানি। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এলএনজি আমদানি সবসময় ঝুঁকিপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ওঠানামা করে। অন্যদিকে আমদানি করতে গিয়ে সরকারকে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়। বিশেষ করে সরকারকে জ্বালানির মূল্য পরিশোধে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম তামিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরুল ইমামসহ একাধিক বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরেই নতুন অনুসন্ধানে বড় বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করা এবং গভীর সমুদ্রে দ্রুত অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দেশীয় গ্যাসের নতুন উৎস আবিষ্কারই হবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রধান পথ। সরকার বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন (বাপেক্সের) মাধ্যমে নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন, আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিকে (আইওসি) দিয়ে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার এবং এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি নতুন উৎপাদন বণ্টন চুক্তি (পিএসসি) নীতিমালার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া দেশের জ্বালানি সংকট সমাধানে আরও একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার; যার মধ্যে রয়েছে একাধিক ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি, একাধিক উৎস থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি; যার মধ্যে রয়েছে স্থল ও সমুদ্রে দ্রুতগতিতে নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা, আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করা, বাপেক্সের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্পে গ্যাসের দক্ষ ব্যবহার এবং অপচয় কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়িয়ে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বড় কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে দেশীয় উৎপাদন আরও কমতে পারে এবং আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়বে। তবে স্থল ও গভীর সমুদ্রে সফল অনুসন্ধান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জ্বালানির বহুমুখীকরণ নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাংলাদেশের গ্যাস সংকট কেবল উৎপাদনের সমস্যা নয়; এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই স্বল্পমেয়াদি আমদানি ব্যবস্থার পাশাপাশি দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার মূল চাবিকাঠি।
এদিকে ২১ জুলাই থেকে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লেগে বিকল হয়ে পড়ায় গত দুই সপ্তাহ ধরে দেশে কয়েক হাজার শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানান, যান্ত্রিক ত্রুটির সমাধান শেষে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) আজ (গতকাল) বিকাল থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু করবে। ফলে আগামী দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। এই সময়ে এফএসআরইউ বন্ধ হওয়ার আগে যেমন ছিল, তেমনই হবে। গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর লোডশেডিং হচ্ছে? এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, স্বাভাবিকভাবে গ্যাস না থাকলে মানুষও পাবে না, আমার পাওয়ার স্টেশনও পাবে না। বিদ্যুতের ভূতুড়ে বিল নিয়ে মন্ত্রী বলেন, এটা যখন আমরা বলি, বিলগুলো নিয়ে আসেন, তখন তো বিল নিয়ে আসে না কেউ আমাদের কাছে। তিনি বলেন, কিছুদিন আগে আপনাদেরই এক সাংবাদিক ফেসবুকে দিয়েছিলেন, তার বিল ছিল সাড়ে ৩ হাজার টাকা, ৭ হাজার টাকা আসছে। আমার লোক পরীক্ষা করে দেখে আসছে, উনি দুটি এসি চালান। উনার ফ্রিজ আছে। ব্লেন্ডার চালান উনি। এত কিছু চালানোর পরও ৭ হাজার টাকা যদি বেশি বিদ্যুতের বিল হয়, আমার মনে হয় না পৃথিবীর কোথাও ৭ হাজার টাকা দিয়ে এরকম এত কিছু চালানো যায়? এদিকে গতকাল ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে মিটিং হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী দেশ, আমাদের অনেক স্বার্থের ব্যাপার আছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাইপলাইনে আরও বেশি পরিমাণে ডিজেল আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে কথা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি শেখ হাসিনা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না। দেশটা ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন উনি। দেশটাকে শেষ করে দিয়েছেন।