জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত সংস্কারের কাজ এখনো এগোয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া উদ্যোগ ও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের নির্ধারিত প্রক্রিয়া থেকে সরে এসেছে বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার। পূর্ববর্তী প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে জাতীয় সংসদে গঠন করা হয়েছে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’। তবে এই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে সংসদের বিরোধী দল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে তারা সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুদক ও পুলিশ সংস্কারের জন্য প্রথমে ছয়টি এবং পরে আরও তিনটি কমিশন গঠন করে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের জন্য গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রায় আট মাস ধরে ৩০টির বেশি দলের সঙ্গে আলোচনা করে ৮৪টি প্রস্তাব সংবলিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করে, যার মধ্যে ৪৮টিই ছিল সংবিধান সংশোধনের সাথে যুক্ত।

এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয় এবং ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ (180) কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার করার কথা বলা ছিল ওই আদেশে। সেখানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ার পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের কথা ছিল। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির সংসদ সদস্যরা নেননি। তারা বাস্তবায়ন আদেশটিকে ‘অবৈধ’ বলে দাবি করেন। ফলে সংস্কার পরিষদ গঠিত হতে পারেনি।

এই অচলাবস্থার মধ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। গত মঙ্গলবার এই কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, তারা জুলাই সনদের যেসব বিষয়ে বিএনপি একমত হয়েছে এবং দলের নিজস্ব নির্বাচনী ইশতেহারের প্রস্তাবগুলোকে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করবেন। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিএনপির ইশতেহারকে প্রাধান্য দিলে মৌলিক সংস্কারের সুযোগ কমে যাবে। যেমন, জুলাই সনদে সারা দেশে পাওয়া ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন ও উচ্চকক্ষকে বিল পাসের ক্ষমতা দেওয়ার কথা থাকলেও বিএনপি চায় নিম্নকক্ষের আসনের ভিত্তিতে আসন বণ্টন করতে এবং উচ্চকক্ষকে বিল পাসের ক্ষমতা না দিতে।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১১০টি বর্তমান সংসদ অনুমোদন করলেও গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অধ্যাদেশ বাদ পড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের জন্য স্বতন্ত্র সচিবালয়, দুদকের ক্ষমতা বৃদ্ধি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালীকরণ এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে বিল আকারে পেশ না করায় সেগুলো কার্যকারিতা হারিয়েছে। মানবাধিকার কমিশনের অধ্যাদেশ অনুমোদন না পাওয়ায় এর চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন এবং পুরোনো আইনেই দুদক গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুম প্রতিরোধ আইনের যে খসড়া প্রকাশ করেছে, তা নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। কারণ সেখানে তদন্তের ভার মানবাধিকার কমিশনের বদলে পুলিশকে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনের সংশোধনীতে পুরোনো মালিকদের ফেরার সুযোগ রাখা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে তা বাতিলে কথা ভাবছে সরকার। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক, সাইবার সুরক্ষা, সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ (যার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়), আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধন (দলের বিচারের বিধানসহ) এবং জুলাই অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তির মতো অধ্যাদেশগুলো সংসদ অনুমোদন করেছে। অধ্যাদেশ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউটও করেছিল।