সুখী দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মান, সহমর্মিতা ও গভীর বিশ্বাস। যখন এই ভালোবাসার জায়গায় অহেতুক সন্দেহ ও অবিশ্বাসের অনুপ্রবেশ ঘটে, তখন সম্পর্কের দূরত্ব বাড়তে থাকে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হয় পারিবারিক কলহ, নির্যাতন এবং বিচ্ছেদ। বর্তমান প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যুগে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং ভার্চুয়াল সম্পর্কের বিস্তার অনেক সময় দম্পতিদের মধ্যে নেতিবাচক আবেগ তৈরি করছে, যা তাদের বৈবাহিক সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে।

ইসলাম একটি স্বচ্ছ ও নিষ্কলুষ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানুষের প্রতি অযথা খারাপ ধারণা পোষণ করার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামি শরিয়তে অহেতুক সন্দেহ করাকে বড় ধরনের মিথ্যাচার হিসেবে গণ্য করা হয়। কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, মুমিনদের উচিত অন্যের ব্যাপারে অহেতুক অনুমান করা থেকে বিরত থাকা, কারণ অনেক ক্ষেত্রে এই ধারণা গোনাহের কাজ। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের সুরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন, তোমরা একে অন্যের গোপনীয় বিষয় খুঁজে বেড়িও না এবং কারো অনুপস্থিতিতে নিন্দা করো না। এছাড়া সুরা আহজাবের ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যারা বিনা অপরাধে ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সন্দেহ করা সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার এবং একে অপরের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করা নিষেধ। ইসলামে অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে যে, যারা অন্যদের দোষ খুঁজে বেড়াবে, আল্লাহ তাদের দোষ ধরবেন এবং তাদের ঘরের ভেতরেও লাঞ্ছিত করবেন (সুনানে আবি দাউদ : ৪৮৮২)।

বর্তমান সময়ে অনেক দম্পতি একে অপরের অগোচরে মোবাইল ফোন বা মেসেজ অ্যাপ চেক করে গোয়েন্দাগিরি করেন, যা ইসলাম সমর্থন করে না। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সফর থেকে ফিরে রাতের বেলা অতর্কিতে ঘরে গিয়ে স্ত্রীর ওপর গোয়েন্দাগিরি করতে নিষেধ করেছেন (বোখারি : ৪৮১২, মুসলিম : ৪৮১৬)।

ইসলামের শিক্ষা হলো, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া না যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত সঙ্গীর ব্যাপারে সুধারণা পোষণ করতে হবে। প্রকাশ্য আচরণ অনুযায়ী সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং গোপনীয় বিষয় আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তাহলে আল্লাহ বৈবাহিক সম্পর্কে বরকত ও শান্তি দান করবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমার উম্মতের মনে যেসব কথা আসে, আল্লাহ তা মাফ করে দিয়েছেন যে পর্যন্ত না সে অনুযায়ী কোনো কাজ করে বা মুখে উচ্চারণ করে (বোখারি : ৬৬৬৪)।

আল্লাহতায়ালা আরও বলেছেন, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না (সুরা বনি ইসরাইল : ৩৬)। এছাড়া সুরা নাজম-এর ২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে বিষয়ে তাদের কোনো জ্ঞান নেই, তারা শুধু ধারণা-অনুমানের অনুসরণ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, তোমরা ধারণা করা থেকে বেঁচে থাক, কারণ ধারণাভিত্তিক কথাই হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা (বোখারি : ৪৮৪৯)। এছাড়া সুরা আনআমের ১১৬ নম্বর আয়াতে এবং সুরা জারিয়াতের ১০ নম্বর আয়াতে অনুমান ও ধারণাভিত্তিক বিভ্রান্তি থেকে সতর্ক করা হয়েছে।

সন্দেহ করা বড় মিথ্যাচার : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সাবধান! তোমরা সন্দেহ করা থেকে বিরত থাক। কারণ, সন্দেহ হচ্ছে সবচেয়ে বড় মিথ্যাচার। পরস্পরের বিরুদ্ধে তথ্য তালাশ কর না এবং গোয়েন্দাগিরি কর না।’ (বোখারি : ৪৯১৭)।