চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। পুলিশ পাহারা, সিসিটিভি ক্যামেরা কিংবা মামলার ভয় কোনো কিছুই দমাতে পারছে না অপরাধীদের। চাঁদার দাবিতে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি চালিয়ে নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছে সন্ত্রাসীরা। নগরের চকবাজার, বায়েজিদ, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, বাকলিয়া, খুলশী, হাটহাজারী ও পতেঙ্গার মতো জনাকীর্ণ এলাকাগুলো এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি চকবাজার থানার চন্দনপুরায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলির ঘটনা ঘটে। ২০১৭ (2017) সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষকতা করা প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় মাদ্রাসা হযরত মুয়াজ বিন জবলের শিক্ষক হাফেজ মো. রেজাউল কবির বললেন, ‘আমি এই এলাকায় আগে কখনো এমন ঘটনা দেখিনি, শুনিওনি।’ চার সন্ত্রাসী পিস্তল, এসএমজি (এসএমজ), চায়নিজ রাইফেল ও শটগান হাতে এসে যখন চন্দনপুরার এই ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলি করে, তখন সেখানে পুলিশের পাহারা ছিল। হঠাৎ বিকট শব্দে শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে। জানালা দিয়ে দেখা যায়, খালের ওপারের বাড়িতে গুলি চালিয়ে সন্ত্রাসীরা চলে যাচ্ছে। মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সন্ত্রাসী সাজ্জাদ প্রথমে ১০ কোটি ও পরে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় গত ২ জানুয়ারিও তাঁর বাসায় গুলি চালানো হয়েছিল। এরপর সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আবারও প্রকাশ্যে গুলি চালানো হয়। এর ২০ দিন আগে সাজ্জাদ হোয়াটসঅ্যাপে ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ লিখে হুমকি পাঠিয়েছিল।
অনুসন্ধান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম শহরে বর্তমানে আটটি আলোচিত সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এগুলো হলো সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্রুপ, সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ গ্রুপ, মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন গ্রুপ, মোহাম্মদ রায়হান গ্রুপ, শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যা বাহিনী, বার্মা সাইফুল গ্রুপ এবং বাকলিয়াকেন্দ্রিক মোরশেদ খান ও আবদুস সোবহান-শওকত গ্রুপ। এর বাইরে মুরাদপুর ও পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। পুলিশের তালিকায় ছোট-বড় মিলিয়ে তিন শতাধিক সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) তথ্যমতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে গত মে মাস পর্যন্ত নগরীতে অন্তত ১২৫টি খুনের মামলা হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই খুন হয়েছেন ২৫ জন। সাম্প্রতিক ৩৫টি আলোচিত হত্যাকাণ্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ২২ জনকেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এসব অপরাধের পেছনে ঘুরেফিরে অন্তত ১৩ জন শুটার বা মাঠপর্যায়ের অস্ত্রধারীর নাম আসছে। এদের মধ্যে মোহাম্মদ বোরহান, মেহেদী হাসান, খোরশেদ আলম, মোবারক ওরফে কালা মোবারক, আবদুল কাদের, মোহাম্মদ ওরফে ভাতিজা মোহাম্মদ, বুইস্যার সহযোগী মুন্না ও বার্মা সবুজ অন্যতম। পুরো চট্টগ্রামজুড়ে এ ধরনের শতাধিক শুটার সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
অপরাধজগতের অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। ২০০০ সালে বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে হত্যার ঘটনায় একে-৪৭ রাইফেলসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। ২০০৪ সালে জামিনে মুক্ত হয়ে দেশ ছাড়ার পর থেকে তিনি বিদেশ বসেই চট্টগ্রামের অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁর দলে অন্তত ৫০ জন শুটার রয়েছে। সাজ্জাদ এখন ধর্মীয় গ্রন্থ ছুঁইয়ে শপথ গ্রহণ ও ভিডিও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে নতুন সদস্য নিয়োগ দিচ্ছেন। বায়েজিদ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া সাইদুল ইসলাম নামের এক সোর্সের মুঠোফোনে পাওয়া ভিডিও থেকে জানা যায়, তিনি বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবনের ভিডিও ধারণ করে সাজ্জাদের কাছে পাঠাতেন এবং জানাতেন কোন ভবন থেকে কত টাকা চাঁদা আদায় করা সম্ভব। এর বিনিময়ে তিনি সপ্তাহে পাঁচ হাজার টাকা পেতেন। সাজ্জাদের এ রকম অর্ধশতাধিক সোর্স রয়েছে।
সাজ্জাদের বিশ্বস্ত সহযোগী ছোট সাজ্জাদ গত ১৫ মার্চ ঢাকায় গ্রেপ্তার হন। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা ও চাঁদাবাজির ১৭টি মামলা রয়েছে। ছোট সাজ্জাদের ডান হাত হিসেবে পরিচিত মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন গত ২৯ জুলাই যশোরে গ্রেপ্তার হন। তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা রয়েছে। সম্প্রতি ডিজিটাল ডট নেট নামের একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক আদিল বিন মামুনের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন ইমন। চাঁদা না পেয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ৩৫ লাখ টাকা লুট করা হয়।
আরেক আলোচিত সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে থাকেন এবং শহরে এসে অপরাধ ঘটিয়ে আবার পাহাড়ে ফিরে যান। তাঁর বিরুদ্ধে বাকলিয়ায় জোড়া খুন ও পতেঙ্গায় ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যাসহ ১৩টি মামলা রয়েছে। অন্যদিকে চান্দগাঁও ও পাঁচলাইশ এলাকার আতঙ্ক শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যার বিরুদ্ধে ২০টি মামলা রয়েছে। বহদ্দারহাটে বুইস্যার একটি নিজস্ব ‘টর্চার সেল’ খুঁজে পায় পুলিশ। চাঁদা ও মাদকের টাকা গণনার জন্য তাঁর সহযোগীদের কাছ থেকে টাকা গণনার মেশিনও উদ্ধার করা হয়েছে।
বাকলিয়া এলাকায় অপরাধের ধরন কিছুটা ভিন্ন। ২০০৩ সালে এলাকাছাড়া হওয়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ছাত্রদল নেতা মোরশেদ খান ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এলাকায় ফিরে আসেন। এতে তাঁর সাবেক সহযোগী আবদুস সোবহানের গ্রুপের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হয়, যার জেরে প্রায়ই গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। এছাড়া বায়েজিদ ও খুলশী এলাকায় চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে বার্মা সাইফুল বাহিনী। সাইফুলকে গত বছরের ১৩ অক্টোবর ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে ২০টি মামলা রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ৬৮টি চাঁদাবাজির মামলা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের অনেকেই ভয়ে মামলা করেননা। যেমন বালুছড়া উত্তর কুলগাঁও এলাকায় থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আহমদ রেজার বাড়িতে চাঁদার দাবিতে ১৫-২০টি গুলি করা হলেও তিনি মামলা করেননি। বাকলিয়ায় এক ব্যবসায়ীর দরজায় লাল দাগ এঁকে হুমকি দেওয়ার পর তিনি ভয়ে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে দেন, কিন্তু পুলিশকে জানাননি।
চট্টগ্রাম নগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, সন্ত্রাসীদের কারণে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ চরম অস্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের কঠোর হস্তে দমন করা উচিত। নগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলামও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান জানান, অধিকাংশ গোলাগুলি ও খুনের ঘটনা ঘটছে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির অর্থ নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। মাদকও এর অন্যতম বড় কারণ। সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, অপরাধীদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসীদের তথ্য দেওয়ার অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানান, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নগরবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে সন্ত্রাসী বাহিনীগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে নিরপেক্ষভাবে আইনের আওতায় না আনলে এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।