আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে ছাত্রলীগ একটি দানবীয় সংগঠনে পরিণত হয়েছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোকে বিতাড়িত করে তারা নিজেরা খুনোখুনি ও দখলদারিতে লিপ্ত হয়। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে শেখ হাসিনা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ছাত্রলীগের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি। বরং সারা দেশে যেকোনো আন্দোলন দমনে হাসিনা ছাত্রলীগকে পুলিশের আগে ব্যবহার করেছেন। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় তারা স্কুলের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মমভাবে আক্রমণ চালিয়েছিল। কোটাবিরোধী আন্দোলনেও পুলিশের পাশাপাশি হেলমেট পরে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মাঠে নেমেছিল ছাত্রলীগ। তাদের হামলায় নারী শিক্ষার্থীসহ বহু ছাত্র আহত ও নিহত হয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রথম সাফল্য এসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়নের মাধ্যমে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ আশা করেছিল ছাত্ররাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসবে। এর কিছু ভালো লক্ষণও দেখা গিয়েছিল। অভ্যুত্থানের সময় ডান-বাম ও ইসলামপন্থি সব ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরা আন্দোলনে শামিল হয়। পারস্পরিক সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত হাসিনার শুধু পতন নয়, তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছিল অনেকটা শান্ত। প্রধান চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দুই বা তিন দশকের বেশি সময় পর নির্বাচন হলেও ছাত্রছাত্রীরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পেয়েছে। নির্বাচনে ছাত্রসংগঠনগুলো কোনো সংঘাতে জড়ায়নি এবং ছোটখাটো আপত্তি ছাড়া নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের বড় অভিযোগ ছিল হলগুলোয় সিট পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পরিবর্তে প্রভাব বিস্তারকারী ছাত্রসংগঠনগুলো ঠিক করত কে হলে থাকতে পারবে, আর কে পারবে না। আবার কখনো কখনো একটি রুমের মধ্যে ১০ থেকে ২০ জন পর্যন্ত রাখা হতো, যাকে বলা হতো গণরুম। এখন এই অবস্থার অবসান হয়েছে। ছাত্র সংসদগুলো প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রভাব দেখিয়ে কোনো ছাত্রনেতা কক্ষ দখল করছে না। নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকার ফলে দীর্ঘদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন পরিবেশ ফিরে পেয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে ছাত্রসংগঠনগুলোর হল দখলের রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কারণে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের পর যে দল ক্ষমতায় আসে, সে দলের ছাত্রসংগঠন সাধারণত হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। এমন ঘটনাও দেখা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগেই পরাজিত দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা হল থেকে পালিয়ে গেছে। কিন্তু এবার প্রথম আমরা ব্যতিক্রম দেখতে পেয়েছি। নির্বাচনের পরও হল দখলের ঘটনা ঘটেনি। এটি নিঃসন্দেহে দেশের ছাত্ররাজনীতির জন্য ইতিবাচক দিক। নিশ্চয়ই ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে এ ধরনের ছাত্ররাজনীতি নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বলে তা সম্ভব হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন হঠাৎ করে সহাবস্থানের বদলে অসহিষ্ণুতার আলামত দেখা যাচ্ছে। আমরা গত এক সপ্তাহে একযোগে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংস ঘটনার চিত্র দেখেছি। এমন এক সময় এমনও সহিংস ঘটনা ঘটেছে, যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় হাসিনার পতনের বার্ষিকীতে নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করছিল। এমনকি এ ধরনের কর্মসূচিতেও হামলার ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্ররা ছিল ঐক্যবদ্ধ। অথচ দুই বছরের মাথায় তারা এখন একে অপরের রক্ত ঝরাচ্ছে। এর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচিত জিএসকে মেরে রক্তাক্ত করা হয়। ভিপিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর আহত যেসব শিক্ষার্থী পাশের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেছে, সেখানে হামলা করা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রেও হাসপাতালে হামলার ঘটনাকে বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। সেখানে প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের কেউ আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে তাকে মারার জন্য আবার যাওয়া গুরুতর অপরাধ। ঢাকার আলিয়া মাদরাসায় হল দখলের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের বহুল আলোচিত এক যুবনেতাকে হেলমেট পরে লাঠি হাতে হলে হলে তল্লাশি চালাতে দেখা গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এভাবে বহিরাগতদের আনা হলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এছাড়া যিনি ছাত্র নন, তিনি কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্র বা লাঠি হাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঢুকবেন? এ ধরনের অতি উৎসাহী কর্মকাণ্ড ক্ষমতাসীন দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে। এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধারণা তৈরি হবে যে, ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এসব ঘটছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বহিরাগতমুক্ত রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে ভূমিকা রাখতে হবে। কেউ সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে দলীয়ভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এই সহিংসতা শুধু ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের ছাত্রসংগঠনের মধ্যে থাকছে না। এর মধ্যে ফ্যাসিবাদী ছাত্রসংগঠনের লুকিয়ে থাকা সদস্যরা অংশ নিচ্ছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার সঙ্গে সাবেক ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে। সম্ভবত বিষয়টি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ৫ আগস্ট এক বিবৃতিতে বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, ‘মাফিয়া হাসিনার বিচার সুনিশ্চিত করার জন্য পুরো বাংলাদেশ এক এবং ঐক্যবদ্ধ। জুলাইয়ের ছাত্রসংগঠনগুলোর মাঝে সাম্যভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে সুন্দর প্রতিযোগিতা ও গঠনমূলক সমালোচনা অব্যাহত থাকবে। ভুল বোঝাবুঝি হলে সেগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে নেব। কিন্তু খুনি হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রশ্নে পুরো ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ থাকব, ইনশাআল্লাহ। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সবসময় ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দেবে।’ ছাত্রদল সভাপতির এই বিবৃতির পর আমরা সহিংসতা কমে আসার ঘটনা দেখছি। কিন্তু তা কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। তবে তিনি ক্যাম্পাসে সুন্দর প্রতিযোগিতা ও গঠনমূলক সমালোচনা অব্যাহত থাকার কথা বলেছেন, একই সঙ্গে যেকোনো ভুল বোঝাবুঝি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছেন। ছাত্রসংগঠনগুলো যদি এই নীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে সংঘাতমূলক পরিস্থিতি সহজেই এড়ানো সম্ভব।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদে বিরোধী দলের ছাত্রসংগঠনের বিজয় ক্ষমতাসীন দলের জন্য অস্বস্তিকর। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমনটাই হওয়া স্বাভাবিক। বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হয়, তার কৃতিত্ব অবশ্যই সরকার পাবে। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে, গত দেড় দশকে তাদের ওপর নানা ধরনের নিপীড়ন গেছে। এর মধ্যে সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা ছিল। যারা এখন ছাত্রসংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের বহু আগেই ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার কথা। নতুন নেতৃত্ব না আসার কারণে নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে না। নবীন শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে হলে প্রয়োজন হবে নতুন নেতৃত্ব। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়া ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতা ২০০৮-০৯ সেশনের একজন ছাত্র। তার বহু আগেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ত্যাগ করার কথা, কিন্তু তিনি এখনো ছাত্রসংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবে নতুন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মনোজগতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। ছাত্ররা এমন পরিবেশ চাইবে না—আধিপত্য বিস্তারকারী কোনো ছাত্রসংগঠন জোর করে তাদের হল থেকে বের করে দেবে, কিংবা মিছিলে নিয়ে যাবে। এমন ঘটনা ঘটলে তারা স্বাভাবিকভাবে প্রতিবাদী হবে। এই ছাত্ররা মাত্র দুবছর আগে আন্দোলনের মাধ্যমে একজন নিষ্ঠুর স্বৈরশাসককে দেশছাড়া করেছে। এই গৌরব তাদের মধ্যে তীব্রভাবে কাজ করে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা গেছে, সহিংসতায় যেসব শিক্ষার্থী আহত হয়েছে, তাদের বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিচার চেয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, ছাত্রসংগঠনগুলোর বাইরেও শিক্ষার্থীদের নিজস্ব প্রতিবাদের ধারা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় ছাত্রসংগঠনকে ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে ছাত্রদের সম্পৃক্ত করার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। পুরোনো ধারার রাজনীতি শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করবে না।
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১০: ১৫আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১০: ৪০