২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া করণ জোহরের ‘কভি আলবিদা না কেহনা’ চলচ্চিত্রটি মুক্তির দুই দশক পরও সমানভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত। শাহরুখ খান, রানি মুখার্জি, প্রীতি জিনতা ও অভিষেক বচ্চন অভিনীত এই সিনেমাটি তৎকালীন ভারতীয় সমাজের প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত সাহসী গল্প তুলে ধরেছিল। দুটি বিবাহিত মানুষের পরকীয়া সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে তৈরি এ ছবি দর্শকদের স্পষ্ট দুটি ভাগে বিভক্ত করে দেয়। কেউ এটিকে বাস্তবসম্মত ও পরিণত দাম্পত্যের চিত্র হিসেবে গ্রহণ করেছেন, আবার কেউ মনে করেছেন এটি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে অতিরিক্ত গ্ল্যামারাইজড বা গ্রহণযোগ্য করে দেখিয়েছে।
সিনেমাটির জমকালো উপস্থাপনা ছিল করণ জোহরের চিরচেনা ধাঁচের। নিউইয়র্কের আকর্ষণীয় লোকেশন, সুন্দর পোশাক এবং ‘মিতওয়া’ ও ‘tumhi dekho na’র মতো তুমুল জনপ্রিয় গান ছবিটিকে বেশ দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। তবে এই ঝলমলে আবরণের নিচে লুকিয়ে ছিল দুটি ভাঙা দাম্পত্যের করুণ ইতিহাস। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পর হতাশায় নিমজ্জিত দেব শরণের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শাহরুখ খান। দেবের এই হতাশা কেবল দুর্ঘটনার কারণে ছিল না; তার স্ত্রী রিয়া শরণের (প্রীতি জিনতা) পেশাগত সাফল্য ও অধিক আয়ও তাকে এক ধরনের হীনম্মন্যতা ও ক্ষোভে ফেলে দেয়। রিয়া যখন সংসার টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন, দেব তখন মায়ার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। এটি একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন তোলে—দাম্পত্যের সমস্যা কি পরকীয়ার অধিকার দেয়?
অন্যদিকে রানি মুখার্জি অভিনীত মায়ার দাম্পত্য জীবনও সুখের ছিল না। তার স্বামী ঋষির চরিত্রে ছিলেন অভিষেক বচ্চন। বিয়ের আগে থেকেই মায়ার মনে এই সম্পর্ক নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। ঋষি ও মায়ার ব্যক্তিত্ব ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী। ঋষি দাম্পত্যে গভীর ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতার বহিঃপ্রকাশ আশা করলেও মায়ার কাছে তা এক ধরনের মানসিক চাপ মনে হতো। ঋষির মধ্যে কিছু অপরিণত আচরণ ও সংবেদনশীলতার অভাব থাকলেও তা কি মায়ার পরকীয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারে? মায়ার সামনে ঋষিকে কেবল বন্ধু হিসেবে মেনে নিয়ে সম্পর্ক নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছিল।
দেব ও মায়ার সম্পর্কটি শুরু হয়েছিল মানসিক স্তরে, যা পরবর্তীতে শারীরিক সম্পর্কে রূপ নেয়। নিজেদের দাম্পত্য জীবনের একাকীত্ব ও হতাশা ভাগ করে নিতে গিয়ে তারা কাছাকাছি আসেন। তবে এই মানসিক পরকীয়াও একদিনে ঘটেনি, বরং একের পর এক মিথ্যা বলা, তথ্য গোপন করা এবং জীবনসঙ্গীদের ঠকানোর মাধ্যমেই এটি পূর্ণতা পায়। সমালোচকদের প্রধান আপত্তি এখানেই যে, সিনেমাটি এই প্রতারণাকে ‘মিতওয়া’ গানের সুর ও নান্দনিক ক্যামেরার কাজের মাধ্যমে অতিরিক্ত রোমান্টিক করে দেখিয়েছে। ফলে দেব-মায়ার আবেগ দর্শকদের স্পর্শ করলেও রিয়া ও ঋষির মানসিক যন্ত্রণা প্রায়শই ঢাকা পড়ে যায়।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে দুই দশক পুরোনো এই সিনেমাটি আমাদের এক ভিন্ন শিক্ষার মুখোমুখি করে। ‘কভি আলবিদা না কেহনা’ হয়তো দেখাতে চেয়েছিল যে সব বিয়ে টিকে থাকে না এবং ভালোবাসা চিরস্থায়ী নয়। তবে এরচেয়েও বড় শিক্ষা হলো সম্পর্কে সুখী না হলে অন্তত সৎ হওয়া প্রয়োজন। প্রতারণার পথ বেছে না নিয়ে সম্পর্ক শেষ করার সাহস দেখানোই যে প্রকৃত সততা, তা আজও এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এক বড় বিতর্কিত প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে।