বাংলাদেশে কোনো পৃথক ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সুযোগ নেই এবং আমরা সবাই এই দেশের সমান অধিবাসী বলে মন্তব্য করেছেন দেশের নীতিনির্ধারক ও বিশিষ্টজনরা। মঙ্গলবার রাজধানীতে চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস রিসার্চ ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী পরিচয়টি অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সংগঠনের চেয়ারম্যান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বিশিষ্ট গবেষক মেহেদী হাসান পলাশ।
বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব এবং পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বহু ভাষা ও নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও সেসব দেশে কোনো পৃথক ‘আদিবাসী’ পরিচয় দেওয়া হয়নি। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সুবিধা দিয়ে মূলধারার সঙ্গে একীভূত করাই রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, অভিবাসী চিন্তাধারার চশমা বা কোনো পশ্চিমা মনোজগৎ দিয়ে বাংলাদেশের জনমিতি ও ইতিহাস বোঝা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, বহিরাগত ক্ষুদ্র গোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করে বা কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে এ দেশের জাতীয় পরিচয় গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর মূল কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, দেশের প্রতিটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের উপস্থিতি ও বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পায়। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র গঠন করা। পাহাড়ি কিংবা সমতলের যেকোনো অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, তবে তা আন্তর্জাতিক চক্রান্তের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া যাবে না। সারজিস আলম বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক অখণ্ডতা নিয়ে কোনো মহলকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। পার্বত্য অঞ্চলে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করার অপচেষ্টা রুখে দিতে তরুণ প্রজন্মকে সদা জাগ্রত থাকতে হবে।
সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে মেহেদী হাসান পলাশ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস ও পরিচয় রাজনীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলায় একটি শক্তিশালী ও সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি। গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এমরান সালেহ প্রিন্স, প্রধানমন্ত্রীর সহকারী রাশেদ খান, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরসহ অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।