জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ সাত নেতার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে প্রসিকিউশন। একই সঙ্গে আসামিদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে প্রসিকিউশনের সমাপনী বক্তব্য শেষে এই আবেদন করা হয়।
এদিন মামলার ষষ্ঠ কার্যদিবসে প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। এরপরই পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবীরা তাদের যুক্তিতর্ক পেশ করতে শুরু করেন।
শুনানি চলাকালে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সপক্ষে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও আইনি যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি আদালতকে বলেন, এই আসামিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া অসংখ্য মানুষ হতাহত হয়েছেন, যাদের সঠিক পরিসংখ্যান এখনও চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। এমন ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রে আসামিদের কোনো ধরনের অনুকম্পা পাওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে প্রসিকিউশন তাদের সর্বোচ্চ সাজা প্রত্যাশা করে।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আইনি বিধান রয়েছে। এর মাধ্যমে আসামিদের অপরাধলব্ধ বা অন্যান্য সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে নিয়ে শহীদ বা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে। তবে সরকার এটি সম্পাদন করলেও সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়াটি আইনে স্পষ্ট করে বলা নেই। তাই রায়ের দিন ট্রাইব্যুনাল যদি এই প্রক্রিয়াটি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে দেন, তবে তা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।
তিনি আরও প্রস্তাব করেন, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ক্ষেত্রে ‘মিউটাটিস মিউটান্ডিস’ (প্রয়োজনীয় পরিবর্তনসহ) নীতি প্রয়োগ করা হলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া সহজতর হবে। এর জবাবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান জানান, এই নিয়মটি প্রস্তুত করতে চিফ প্রসিকিউটর ও তার কার্যালয় এবং ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২ যৌথভাবে বসে আলোচনা করে একটি রুল তৈরি করতে পারে। চিফ প্রসিকিউটর তখন আদালতকে অবহিত করেন যে, তিনি ইতিমধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন এবং তিনিও এতে সম্মতি দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ৪ঠা আগস্ট এই মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়েছিল। প্রথম দিন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম পুরো মামলার সামগ্রিক পটভূমি আদালতের সামনে তুলে ধরেন। টানা পাঁচ কার্যদিবস ধরে প্রসিকিউশনের যুক্তি উপস্থাপনের পর এখন ডিফেন্স আইনজীবীদের বক্তব্য শুনছেন আদালত। এই মামলার অভিযুক্ত সাত আসামি হলেন— আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান। অভিযুক্ত এই সাত নেতার সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।