অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দীর্ঘ ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমে প্রথম দিনটি নিজেদের করে নিয়েছে বাংলাদেশ। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে ২২ বছর পর টেস্ট ক্রিকেটের প্রত্যাবর্তন দিবসে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানেই গুটিয়ে দিয়েছে সফরকারীরা। হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ের পর প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে ১ উইকেটে ৯৬ রান তুলে দিন শেষ করেছে বাংলাদেশ।
টস জিতে সকালে ব্যাটিংয়ে নামা অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটাররা শুরু থেকেই বাংলাদেশি পেসারদের তোপের মুখে পড়েন। প্রথম সেশনেই ৭৪ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়ে স্বাগতিকরা। দ্বিতীয় সেশনেও আরও ৪টি উইকেট হারায় তারা। শেষ পর্যন্ত চা-বিরতির পর মাত্র ৫ ওভারের মধ্যে শেষ দুই উইকেট হারিয়ে ১৯৮ রানে অলআউট হয় প্যাট কামিন্সের দল।
বাংলাদেশের এই দুর্দান্ত বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছেন হাসান মাহমুদ। ৫৫ রানে ৬ উইকেট নিয়ে ক্যারিয়ার সেরা বোলিং করেছেন এই ডানহাতি পেসার। এটি টেস্টে তাঁর তৃতীয়বারের মতো ৫ বা তার বেশি উইকেট নেওয়ার কীর্তি। যেকোনো সংস্করণে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম বাংলাদেশি বোলার হিসেবে ৫ উইকেট নেওয়ার রেকর্ডও গড়লেন হাসান। অন্য প্রান্তে হাসানকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন। বাকি ৪টি উইকেট সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছেন এই দুই পেসার। টেস্ট ইতিহাসে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার এক ইনিংসে প্রতিপক্ষের ১০ উইকেটের সবকটিই নিলেন বাংলাদেশের পেসাররা। এর আগে ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েছিলেন তাঁরা, সেবারও হাসান ৫ উইকেট নিয়েছিলেন।
ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামের উইকেটটি দুই দলের কাছেই ছিল অপরিচিত। তবে সকালে টসের পর অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার ট্রাভিস হেড উইকেট নিয়ে বলেছিলেন, পিচ বেশ শক্ত এবং যথেষ্ট ঘাস রয়েছে। এমন উইকেটের সুবিধা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা। নতুন বলে শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের অস্বস্তিতে রাখেন তাসকিন ও হাসান। ১২তম ওভারে ডারউইনের ঘরের ছেলে জেক ওয়েদারাল্ডকে ২৩ রানে উইকেটের পেছনে লিটন দাসের ক্যাচ বানিয়ে প্রথম ব্রেকথ্রু এনে দেন হাসান। এরপর ট্রাভিস হেডকে ২২ রানে ফিরিয়ে ডারউইনের প্রথম দিনটি নিজের করে নেন তিনি। ইংলিশ কাউন্টিতে ভালো করে আসা হাসানকে নিয়ে এ সময় প্রেসবক্সে অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিকদের মধ্যেও বাড়তি আগ্রহ দেখা যায়।
অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে একাই প্রতিরোধ গড়েছিলেন অভিজ্ঞ ব্যাটার স্টিভেন স্মিথ। ব্যক্তিগত ২ রানে স্লিপে তানজিদ হাসানের হাতে জীবন পাওয়ার পর তিনি খেলেন ১০৯ বলে ৭১ রানের ইনিংস। শেষ পর্যন্ত হাসান মাহমুদের বলেই ডাউন দ্য উইকেটে এসে মারতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন তিনি। হাসানের শিকার হওয়া প্রথম চার উইকেটের তিনটিই ছিল উইকেটের পেছনে লিটনের ক্যাচ এবং একটি ছিল বোল্ড। অন্য দুই পেসার তাসকিন ও ইবাদতও দুর্দান্ত বল করেছেন। ইবাদত ৩৯ রানে ২টি এবং তাসকিন ৫৫ রানে ২টি উইকেট নেন।
বাংলাদেশের পেসারদের এমন পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়েছেন গ্যালারিতে থাকা অস্ট্রেলিয়ার সাবেক কিংবদন্তিরা। মার্ভ হিউজ, মার্ক ওয়াহ, রিকি পন্টিং, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, জেসন গিলেস্পি, ম্যাথু হেইডেন ও সাইমন ক্যাটিচদের মতো তারকারা ডারউইনে ধারাভাষ্যকার হিসেবে উপস্থিত আছেন। সাবেক ফাস্ট বোলার মার্ভ হিউজ চা-বিরতির সময় হাসানের প্রশংসা করে তাঁকে ‘টু গুড বোলার’ বলে আখ্যা দেন এবং বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের সার্বিক উন্নতির প্রশংসা করেন।
জবাবে ব্যাটিংয়ে নেমে ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই শূন্য রানে জীবন পান বাংলাদেশের ওপেনার তানজিদ হাসান। জশ হ্যাজলউডের বলে তাঁর তোলা আকাশছোঁয়া ক্যাচটি লুফে নিতে পারেননি নাথান লায়ন। আরেক ওপেনার সাদমান ইসলামও শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ঢঙে খেলার চেষ্টা করেন। তবে থিতু হওয়ার পর নবম ওভারে মিচেল স্টার্কের ১৪৩.৪ কিলোমিটার গতির বলে কাভার পয়েন্টে লায়নের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন সাদমান। আউট হওয়ার আগে তিনি করেন ৩০ বলে ২০ রান।
সাদমানের বিদায়ের পর আর কোনো উইকেট হারাতে দেয়নি বাংলাদেশ। তানজিদ হাসান ৩৫ রানে এবং অভিজ্ঞ মুমিনুল হক ৩৫ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেন। দ্বিতীয় উইকেটে তাঁদের অবিচ্ছিন্ন ৬০ রানের জুটির ওপর ভর করে প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশ এখন অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ১০২ রানে পিছিয়ে রয়েছে।