২০১৬ সালে প্রায় দুই মাস গুম করে রেখে অমানবিক নির্যাতন এবং পরবর্তীতে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাক্ষ্য দিয়েছেন রংপুরের চিকিৎসক ডা. আশিক উল আকবর। বৃহস্পতিবার টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুমের ঘটনায় বর্তমান ও সাবেক ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তার এই জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে আসামিপক্ষের জেরা চলছে এবং ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৬ই আগস্ট দিন নির্ধারণ করেছেন।
জবানবন্দিতে ডা. আশিক জানিয়েছেন, ২০১৬ সালের ২৩ মে রাত সাড়ে ৩টার দিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে মামার বাসায় থাকা অবস্থায় ১০-১২ জন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি তাকে তুলে নেয়। চোখ বেঁধে ও মারধর করে একটি কালো মাইক্রোবাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে প্রায় ৬০ দিন একটি কক্ষে ২৪ ঘণ্টা চোখ বেঁধে ও দুই হাত পেছনে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখা হতো। দিনে মাত্র দুইবার টয়লেটের সুযোগ দেওয়া হতো এবং নির্ধারিত সময়ের হেরফের হলে মারধর করা হতো বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আশিক আরও জানান, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তাকে জঙ্গি সংগঠনের সদস্য হিসেবে স্বীকারোক্তি দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। অস্বীকার করলে তাকে মারধর করা হতো এবং হাতের সঙ্গে গামছা বেঁধে হুকের মাধ্যমে ঝুলিয়ে রাখা হতো। তার অভিযোগ, নির্যাতনের এক পর্যায়ে তার দুই কানের লতিতে বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছিল। সহ্য করতে না পেরে তিনি তাদের কথামতো স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হন। এরপর একটি মুদ্রিত কাগজ দেখে তাকে সাদা কাগজে লিখতে বাধ্য করা হয় এবং তার ফেসবুক আইডি ও পাসওয়ার্ড নিয়ে নেওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, তার চোখের রেটিনা, ১০ আঙুলের ছাপ এবং লিখিত বক্তব্যের ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় চোখ বেঁধে রাখার কারণে তার ডান চোখের রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্তির পর ৮ সেপ্টেম্বর তিনি অস্ত্রোপচার করান।
মুক্তি পাওয়ার আগের পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে আশিক বলেন, চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে চুল কেটে ও দাড়ি সেভ করে পুনরায় হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। এরপর ‘র্যাব’ লেখা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরিয়ে মাইক্রোবাসে করে র্যাব-১-এর মিডিয়া সেন্টারে নেওয়া হয়। সেখানে তার পেছনে অস্ত্র, গোলাবারুদ, নাট-বল্টু ও বই সাজিয়ে ছবি তোলা হয়, যা পরে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর টঙ্গী থানায় নেওয়া হয় এবং ২০১৬ সালের ২১ জুলাই তাকে ও আরও তিনজনকে আসামি করে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়।
তিনি জানান, তার বাবা গুমের সময় জয়দেবপুর থানায় মামলা করেছিলেন, কিন্তু মামলা প্রত্যাহারের চাপ দেওয়া হয়। মামলা প্রত্যাহার না করায় তাকে ডেমরা ও আশুলিয়া থানার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। তিনি জানান, ডেমরা থানার মামলায় ২০১৮ সালে অব্যাহতি পান, টঙ্গী থানার একটি মামলা ২০১৭ সালে হাইকোর্টে স্থগিত হয় এবং আশুলিয়া থানার মামলায় ২০২৬ সালের জুনে তিনি বেকসুর খালাস পান। প্রায় ১৩ মাস কারাগারে থাকার পর হাইকোর্টের আদেশে তিনি মুক্তি পান। এই ঘটনার কারণে তার চিকিৎসাশিক্ষা তিন বছর পিছিয়ে যায় এবং ২০২৩ সালে তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করতে সক্ষম হন।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন স্টেট ডিফেন্সের আইনজীবী ইশরাত জাহান। তিনি ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের পক্ষে সাফাই গেয়ে দাবি করেন, তার মক্কেলরা ছাত্র-জনতাকে হত্যা বা আহত করার কোনো নির্দেশ দেননি। প্রসিকিউশন অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য দিলেও হত্যার নির্দেশ দেওয়ার কোনো প্রমাণ নেই বলে তিনি দাবি করেন। ‘যারা নিজেদের রাজাকার দাবি করে, তাদের আমরা শেষ দেখে নেব’—এই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় আইনজীবী বলেন, ‘শেষ করা’ বলতে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বোঝানো হয়েছে। নিখিলের হাতে অস্ত্র ছিল না বলেও তিনি দাবি করেন। আগামী ১৬ আগস্ট আইনজীবী তার বাকি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাত। সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।