স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৮ জন ব্যক্তি ২২ মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে ১০ জন রাষ্ট্রপ্রধান তাদের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি, যার মধ্যে ৭ জন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। এছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্দোলনের মুখে ৮ জনকে বঙ্গভবন ছাড়তে হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকাকালে দুজন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুন পদত্যাগ করার পর বর্তমানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতি হন এবং একই বছরের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। তার অনুপস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। এরপর স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত অস্থায়ী এবং পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। খন্দকার মোশতাক আহমেদ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করলেও মাত্র ৮১ দিন পর ৩ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। তার মৃত্যুর পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার উপরাষ্ট্রপতি থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত হয়ে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর বিচারপতি আবুল ফজল মোহাম্মদ আহ্সান উদ্দীন চৌধুরী ২৭ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণ করে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিলেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পদে বহাল ছিলেন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ১৯৯০ সালের এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত কেয়ারটেকার সরকার পরিচালনা করেন। পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তিনি আবারও রাষ্ট্রপতি হন এবং ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার মাঝে আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত মেয়াদ পূর্ণ করেন।
একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর শপথ নিয়ে ২০০২ সালের ২১ জুন পদত্যাগ করেন। এরপর স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়ে ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মোঃ জিল্লুর রহমান ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণ করে ২০১৩ সালের ২০ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বহাল ছিলেন।
মোঃ আবদুল হামিদ বাংলাদেশে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন এবং দুই মেয়াদে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন। এরপর মোঃ সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং শারীরিক জটিলতার কারণ দেখিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন।
১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮৬ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন তিনি।
১৯৮৬ সালে বিতর্কিত একটি নির্বাচন আয়োজন করে আবারো রাষ্ট্রপতি হন এবং শেষে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন।