তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কবলে পড়ে দেশের শিল্প খাতে ভয়াবহ স্থবিরতা নেমে এসেছে। চাহিদামতো গ্যাস এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না পাওয়ায় শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন বর্তমানে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় উদ্যোক্তারা চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বকেয়া বেতন, ব্যাংক ঋণ ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে ব্যর্থ হয়ে অনেক শিল্পাঞ্চলের শত শত কারখানা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, স্বাভাবিক সময়ে দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে এলএনজি সরবরাহ ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে যাওয়ায় মোট গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ১ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। বুধবার ২ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল। বিশেষ করে শিল্পকারখানায় গ্যাসের প্রেসার অত্যন্ত কম। অনেক ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ পিএসআই-এর পরিবর্তে মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই প্রেসার পাওয়া যাচ্ছে। উদ্যোক্তারা ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করলেও তাতে উৎপাদন খরচ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, রি-রোলিং মিল ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পেরে অনেক রপ্তানিকারক আকাশপথে ব্যয়বহুল এয়ার ফ্রেইটে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করছেন, যা আগামী মৌসুমের জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে শিফট কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেক কারখানা কর্মীদের ওভারটাইম বন্ধসহ কর্মী ছাঁটাইয়ের পথও বেছে নিয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বৃহস্পতিবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির মালিকানাধীন ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি মেরামত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং প্রকৌশলীদের প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করা ছাড়া আপাতত আর কিছু করার নেই। তিনি বলেন, দিন গোনা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। এদিকে গ্যাস সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ খাতেও পড়েছে। রাজধানীতে বুধবার রাত থেকেই লোডশেডিং শুরু হয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৩০টিতেই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে এবং নিয়মিত গ্যাস সরবরাহের দাবিতে বৃহস্পতিবার জামালপুরে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা। এমনকি বেশ কয়েকটি জেলার বাসিন্দারা রান্নাবান্না করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সরকারকে দ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের রোডম্যাপ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।