গত সপ্তাহে ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৯ সালে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) পাঁচ ট্রিলিয়ন বা পাঁচ লাখ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে। চক্রবৃদ্ধি হারে প্রবৃদ্ধির সাধারণ হিসাবের ওপর ভিত্তি করে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ভারতের বর্তমান অর্থনীতির আকার প্রায় চার লাখ কোটি ডলার। দেশটি ক্রমেই বড় হচ্ছে, তাই পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জন একদিন সম্ভব হতে পারে। তবে এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে অধিকাংশ ভারতীয় নাগরিকের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি রয়েছে, কারণ মোদি সরকারের আমলে এই কথা বারবার বলা হয়েছে।

ভারতের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে এই ধরনের বারবার দেওয়া প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে। মোদি সরকার বারবার স্বপ্ন দেখালেও তা অর্জনের কোনো বিস্তারিত রূপরেখা হাজির করেনি, আবার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পর কোনো ব্যাখ্যাও দেয়নি। ২০১৮ সালে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সভায় মোদি ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। ২০১৯ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে তিনি এই সময়সীমা কমিয়ে ২০২৪ সাল নির্ধারণ করেন। কিন্তু সেই সময়সীমা নীরবে পার হয়ে গেছে, অথচ ভারত সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। সরকার বিষয়টি স্রেফ উপেক্ষা করে গেছে।

বিজেপি সরকার এখন ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের অর্থনীতি ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার নতুন লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক হিসাব–নিকাশে কী পরিবর্তন এসেছিল, তা কখনো প্রকাশ করা হয়নি। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে ২০২০–২১ অর্থবছর ছিল সবচেয়ে খারাপ সময়। এরপরও সরকারের পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০২২ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও একই লক্ষ্যমাত্রার কথা পুনরাবৃত্তি করেছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিভ্রান্তি তৈরির পেছনে সরকারের রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে। অনুগত সংবাদমাধ্যমের কারণে সরকারের অতিরিক্ত আশাবাদী লক্ষ্য নিয়ে কেউ তেমন প্রশ্ন তোলেনি। বর্তমানে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ স্থানে নেমে এসেছে। গত ১১ আগস্ট সংসদে সরকার স্বীকার করেছে, ভারত এখনো চার লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছাতে পারেনি। সরকার রুপির দরপতনকে এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী করার চেষ্টা করলেও, রুপির মান কমে যাওয়া নিজেই অর্থনীতির দুর্বলতার লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মোদির তৃতীয় মেয়াদে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এর পাশাপাশি জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান দেশটির তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা ভারতের জিডিপিতে প্রায় ৭ শতাংশ অবদান রাখে। সামাজিক সুরক্ষাব্যবস্থার অভাব এবং উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পাওয়ার কারণে ভারতীয়রা এখনো বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে রয়ে গেছে। মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে ভারত অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার চেয়েও পিছিয়ে আছে। ঝাড়খন্ডে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক গভীর সংকট ফুটে উঠছে, যা মোদি সরকারের গালভরা দাবির অসারতাকে সামনে নিয়ে আসছে।