প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে কয়েক দিন ধরে কূটনৈতিক যোগাযোগ চললেও, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দুই দিনের এই সফরের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে প্রাথমিক প্রস্তাব দেওয়া হলেও, সংবেদনশীল ইস্যুগুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সফর চূড়ান্ত হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দিল্লিতে অবস্থানরত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে দুই প্রতিবেশী দেশের মতপার্থক্য এখনো দূর হয়নি।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা শেষে গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঢাকা ফিরেছেন। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের বিশেষ বার্তা মোদির কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। আজ শনিবার হাইকমিশনার ত্রিবেদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করতে পারেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে একটি 'সহায়ক পরিবেশ' তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ভারতে বসে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি ঢাকাকে ক্ষুব্ধ করেছে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনা অনলাইনে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়। ভারত সরকার এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ রাখার আশ্বাস দিলেও তা রক্ষা না করায় ওই রাতেই কড়া প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে বাংলাদেশের sovereignty বা সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা ও জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এই ঘটনার দুই দিন পর ৭ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল জানান, বাংলাদেশের বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে ওই মঞ্চ থেকে দেওয়া কোনো বক্তব্য ভারত সরকার অনুমোদন করে না। তবে গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জয়সোয়াল বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে দ্বিপক্ষীয় সফর, বিমসটেক চেয়ারম্যান ও ব্রিকস আসরের জন্য আগেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কোনো অগ্রগতি হলে তা পরে জানানো হবে। এদিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক 'দ্য ট্রিবিউন' দাবি করেছে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে অগ্রগতি না হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন না—এমন বার্তা হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে জানিয়েছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে, ভারত সরকার শহীদ ওসমান হাদির হত্যাকারীদের দ্রুত প্রত্যর্পণে প্রস্তুত রয়েছে বলে ঢাকাকে বার্তা পাঠিয়েছে।
ভারতের রাজ্যসভাতেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য রাজীব কুমার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন সিং প্রশ্নটি এড়িয়ে যান, যা দিল্লির সতর্ক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সম্ভাব্য এই সফরে বাণিজ্য, ট্রানজিট, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই আগামী সোমবার তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসছে ভারতের শীর্ষস্থানীয় বণিক সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের (সিআইআই) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। প্রায় ছয় মাস আগে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই ভারতের কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের প্রথম বাংলাদেশ সফর, যা দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের জ্যোষ্ঠ মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করবে।