বঙ্গভবন থেকে মাত্র ২০০ মিটার এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৬০০ মিটারের দূরত্বে অবস্থিত গুলিস্তান এলাকাটি বর্তমানে অপরাধীদের এক বিশাল আখড়ায় পরিণত হয়েছে। একসময় ফুলের বাগান হিসেবে পরিচিত এই এলাকাটি এখন ছিনতাই, পকেটমার এবং মাদক ব্যবসার জন্য কুখ্যাত। সাধারণ মানুষ, এমনকি পুলিশ কর্মকর্তারাও এখানে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গুলিস্তানে পকেট থেকে মুঠোফোন বের করতেও তিনি ভয় পান। এমনকি তিনি এয়ারবাড ব্যবহার করে কথা বলেন, কারণ মুঠোফোন বের করলেই ছিনতাইকারীরা তা ছোঁ মেরে নিয়ে যেতে পারে।

গুলিস্তানের এই অপরাধীচক্রের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত সর্বস্ব হারাচ্ছে। চার বছর আগে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথে লেখক নিজেও সেখানে মুঠোফোন হারিয়েছিলেন। ৯ আগস্ট সরেজমিন অনুসন্ধানে জুতা বিক্রেতা সোলাইমান কবির জানান, বাসের জানালা দিয়ে যাত্রীদের কানের দুল বা মুঠোফোন ছিনতাইয়ের ঘটনা সেখানে নিয়মিত ঘটছে। ১০ আগস্ট জিরো পয়েন্ট এলাকায় এক নারীর কানের দুল ছিনতাইয়ের সময় তাকে রক্তাক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে।

এলাকাটিতে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি চলছে। হকারদের কাছ থেকে দৈনিক ১০০ থেকে ২০০ টাকা এবং দোকানভেদে মাসিক ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা তোলা হয়। ঢাকা ট্রেড সেন্টারের উত্তর পাশে জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তি খাজনার নামে চাঁদা তুলছিলেন। এছাড়া সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের সামনে পণ্যবাহী যানবাহন ও ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলার সময় রসিদও দেওয়া হয়, যেখানে ইজারাদার হিসেবে বংশাল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ নিয়াজ মোর্শেদের (জুম্মন) নাম রয়েছে। তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা মো. জয়নুল আবেদীন এই রসিদকে অবৈধ বলে অভিহিত করেছেন।

চাঁদাবাজির অভিযোগের তালিকায় বংশাল থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মামুন আহমেদ, ডালিম হোসেন এবং যুবদল নেতা রনজুদের নামও উঠে এসেছে। তবে অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হয়েছে মাত্র। ২০১৯ সালে ইতালিয়ান সোসিওলজিক্যাল রিভিউতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফুটপাতের হকারদের ৭০ শতাংশকেই কোনো না কোনো পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়, যার মধ্যে ৪৩ শতাংশ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ৩৫ শতাংশ পুলিশ বা কর্তৃপক্ষ এবং ১৪ শতাংশ সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যুক্ত।

গুলিস্তান একক কোনো থানার অধীনে নয়; এটি পল্টন, শাহবাগ ও বংশাল থানার সীমানায় বিভক্ত। অপরাধ দমনে পুলিশের চেষ্টা থাকলেও অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই কাজে লিপ্ত হয় বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ ওসমান গণি। ১৯৫৩ সালে নির্মিত গুলিস্তান সিনেমা হলকে কেন্দ্র করে এলাকাটির নাম হলেও, বর্তমানে এই এলাকাটি বিশৃঙ্খলা ও অপরাধের সমার্থক হয়ে উঠেছে। চলচ্চিত্রবিষয়ক সাংবাদিক অনুপম হায়াৎ লিখেছেন, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর কলকাতার ব্যবসায়ী খান বাহাদুর ফজল আহমেদ দোশানি এই প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেন। বর্তমানে সেখানে বেচাবিক্রি হোক বা না হোক, হকারদের প্রতিদিন ৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়।