মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত জলসীমায় টানা প্রায় নয় মাস ধরে মোতায়েন রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। সাধারণত মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোকে ছয় মাসের জন্য মোতায়েন করা হলেও, এই জাহাজটির ক্ষেত্রে সেই সময়সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রে অবস্থান করার কারণে জাহাজটিতে থাকা প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও সেনার মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত আট মাসে ‘আব্রাহাম লিংকন’ থেকে ১০ হাজারেরও বেশি যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করেছে। এই দীর্ঘ সময়ে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সার্বক্ষণিক আশঙ্কার মধ্যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে সেনাদের। স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চঝুঁকি ও অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে সেনাদের ওপর মারাত্মক মানসিক চাপ তৈরি হয়েছে।

জাহাজে থাকা এক নাবিকের বাবা জেফারসন কেলি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পুরোনো এই যুদ্ধজাহাজটিকে সচল রাখতে নাবিকদের দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করতে হচ্ছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে তাদের সমুদ্রে আটকে রাখা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। প্রয়োজনে ছেলের পরিবর্তে তিনি নিজেই জাহাজে গিয়ে দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত, তবুও তার সন্তানকে যেন দ্রুত পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এদিকে রণতরীটির ভেতরের পরিবেশ নিয়েও নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জাহাজে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, বাথরুমের অব্যবস্থাপনা এবং নাবিকদের মানসিক বিপর্যয়ের বিষয়ে জবাবদিহি চেয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে চিঠি পাঠিয়েছেন সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল।

তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এসব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছে। তাদের দাবি, জাহাজে কোনো প্রাণহানি বা আত্মহত্যার ঝুঁকির তথ্য সঠিক নয়। নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে কিছু সরঞ্জাম পৌঁছাতে দেরি হলেও জাহাজে পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সচল রয়েছে। এছাড়া সেনাদের মানসিক সহায়তার জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসক ও কাউন্সেলর নিয়োজিত আছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথও জাহাজের দুরবস্থার এসব দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু সামরিক কর্তৃপক্ষের এমন আশ্বাসে শান্ত হতে পারছেন না উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যরা। গত সপ্তাহে তারা নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে তাদের ক্ষোভ ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। অনেক অভিভাবকই চিঠি লিখে তাদের সন্তানদের অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছেন।

এরই মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর স্থলাভিষিক্ত হতে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে আরেকটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’। তবে দায়িত্ব হস্তান্তরের আনুমানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আব্রাহাম লিংকনের যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।