ব্রাজিলের দুটি বৃহত্তম অপরাধী চক্র পিসিসি ও সিভিকে ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াশিংটন ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নিজস্ব সংজ্ঞা চাপিয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিলের সুদূর-ডানপন্থীরা এই সিদ্ধান্তকে আন্তদেশীয় সংগঠিত অপরাধের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের বিরুদ্ধে একটি জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরছে, তবে বাস্তবতা হলো এটি নিরাপত্তার চেয়ে রাজনীতির সঙ্গে অনেক বেশি সম্পর্কিত। এই ঘোষণার পেছনে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের সাম্রাজ্যবাদী ও হস্তক্ষেপকারী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে, যা ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন-সমর্থিত সামরিক স্বৈরাচারের ভয়াবহ স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।

পিসিসি ও সিভি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ সহিংসতার জন্য দায়ী এবং লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর মধ্যে অন্যতম। তবে কোনো গোষ্ঠীর সহিংসতা কতটা চরম, কেবল তা দিয়ে তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। সন্ত্রাসবাদের ধারণাটি নিয়ে নানা মত থাকলেও, রাজনৈতিক বা আদর্শগত লক্ষ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডকেই মূলত সন্ত্রাসবাদ বলা হয়। পিসিসি ও সিভি হয়তো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের প্রভাবিত করে, নির্দিষ্ট এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয় কিংবা নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রের মুখোমুখি দাঁড়ায়, কিন্তু তাদের মূল লক্ষ্য অপরাধভিত্তিক ক্ষমতা অর্জন ও অর্থ উপার্জন। রাজনীতি তাদের জন্য অপরাধের সাম্রাজ্য রক্ষা ও বিস্তৃত করার মাধ্যমমাত্র, এটি তাদের অস্তিত্বের মূল উদ্দেশ্য নয়। সরকারগুলো যত ঢালাওভাবে সন্ত্রাসবাদ শব্দটির ব্যবহার বাড়াবে, আসল নিরাপত্তা হুমকির ধরন তত বেশি আড়াল হবে এবং রাষ্ট্রগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিতে এই তকমা ব্যবহারের সুযোগ পাবে।

পিসিসি ও সিভি কোনো নতুন হুমকি নয়; পিসিসি নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই সক্রিয় আর সিভি তার চেয়েও পুরোনো। তাহলে ২০২৬ সালে এসে হঠাৎ যুক্তরাষ্ট্র কেন এই সিদ্ধান্ত নিল? এর উত্তর মার্কিন নিরাপত্তা মূল্যায়নে নয়, বরং ব্রাজিলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিহিত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দা সিলভার সরকারের বিরুদ্ধে বলসোনারো পরিবারের রাজনৈতিক লড়াইয়ে ওয়াশিংটনকে টানার চেষ্টার সঙ্গেই এ ঘোষণার সময় জড়িয়ে রয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর অভ্যুত্থানের চেষ্টার দায়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো ২৭ বছর ৩ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করছেন, আর তাঁর ছেলেরা এখন এ রাজনৈতিক যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের দরবারে নিয়ে গেছেন।

অতি ডানপন্থীদের মিছিল-সমাবেশে বলসোনারোর সমর্থকদের মার্কিন পতাকা হাতে দেখা যায়, যেখানে তারা বামপন্থীদের হাত থেকে ব্রাজিলকে বাঁচাতে প্রকাশ্যেই সামরিক ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের দাবি জানায়। সাবেক প্রেসিডেন্টের অন্যতম ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো কয়েক মাস ধরে লুলাকে সংগঠিত অপরাধের প্রতি নরম হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। পিসিসি ও সিভিকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করতে ট্রাম্প প্রশাসনকে সরাসরি চাপ দেওয়াসহ লুলার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের পেছনে লেগে ছিলেন। তাঁর ভাই এদুয়ার্দো বলসোনারো, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন, বাবার বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে আরও এক ধাপ এগিয়ে ব্রাজিলীয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া এবং ব্রাজিলের পণ্যে শুল্ক আরোপের জন্য তদবির চালিয়েছিলেন।

ফ্লাভিওর এ লবিংয়ের সরাসরি একটি নির্বাচনী গুরুত্বও আছে। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে তিনি লুলার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন। ১১ আগস্টের একটি সিএনটি/এমডিএ জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রথম রাউন্ডে লুলার সমর্থন ৪২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ফ্লাভিওর পক্ষে রয়েছে ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। এ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এ সন্ত্রাসী তকমা অতি ডানপন্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে। এটি ব্রাজিলের সুদূর-ডানপন্থীদের তৈরি করা সেই পুরোনো বয়ানকেই জোরদার করে, যেখানে লুলাকে অপরাধী চক্রের সহযোগী বা তাদের দমনে অনিচ্ছুক হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। এর উদ্দেশ্য লুলার অপরাধ প্রমাণ করা নয়; বরং এমন একটি সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করা যাকে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় এবং ব্রাজিলে মার্কিন হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে সাহায্য করে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্রাজিলে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে এবং আর্থিক লেনদেন সংস্থাগুলো কঠোর নজরদারির মুখে পড়বে। যদি পিসিসি বা সিভির কোনো ফান্ড পিক্স নামক সেন্ট্রাল ব্যাংকের ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়, তবে সন্ত্রাসী ঘোষণার অজুহাতে এই ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত মার্কিন নজরদারি চেপে বসবে। এছাড়া, ব্রাজিলের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে এ ঘোষণার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রচলিত পুলিশি সহযোগিতা জটিল হয়ে পড়তে পারে। পিসিসি ও সিভি-সংক্রান্ত যৌথ তদন্ত এখন গোপনীয় জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা চ্যানেলে স্থানান্তরিত হতে পারে, যা পারস্পরিক নিরাপত্তামূলক সংহতি ও অবাধ সহযোগিতাকে শক্তিশালী করার বদলে আরও কঠিন করে তুলবে।

ব্রাজিলে সংঘটিত অপরাধের গভীর সংকট রয়েছে, যা কাটাতে দরকার কঠোর আইন প্রয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। কিন্তু অপরাধী চক্র দমনে তাদের মূল স্বরূপ বোঝা জরুরি, স্বার্থান্বেষী রাজনীতিকেরা তাদের যেভাবে আঁকতে চান, সেভাবে নয়। যুক্তরাষ্ট্র একটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমস্যাকে ভূ-রাজনৈতিক ও আদর্শিক যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করছে।