অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফাসায়েল গ্রামের ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস ছিল একটি পানির ফোয়ারা। বহু প্রজন্ম ধরে খাবার পানি ও কৃষিকাজের জন্য এই ফোয়ারার ওপরই নির্ভর করে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে অতি সম্প্রতি সেই পানির উৎসটি দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। ফিলিস্তিনিদের ফসলি জমিতে সেচ দেওয়ার পানি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে সেখানে তৈরি করা হয়েছে একটি সাঁতার কাটার পুল, যা এখন ইসরায়েলি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। অধিকৃত অঞ্চলজুড়ে ফিলিস্তিনিদের পানিসম্পদ দখলের এটি একটি বড় উদাহরণ।
স্থানীয় ফিলিস্তিনি কৃষক সাদ নেমার জানান, গত জুনে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা তাঁর সেচের পাইপলাইন দখল করে নেয়। এরপর সেই পানি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের প্রাচীন পুলে প্রবাহিত করতে শুরু করে। বর্তমানে এই পুলটির চারপাশে একটি বিনোদন পার্ক তৈরির কাজ চলছে। পানির অভাবে নেমারের গ্রিনহাউস ও কৃষিজমি এখন শুষ্ক ও রোদে পোড়া মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে আগে বেগুন, স্কোয়াশ এবং তরমুজের ফলন হতো। নেমার বলেন, ‘আমাদের পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েছি। এর ফলে অনেক পরিবার কাজ ও জীবিকা হারাবে।’
এই ফোয়ারার মালিকানা নিয়ে নেমার ২০২৫ সালের একটি জমির মালিকানা–সংক্রান্ত দলিল দেখিয়েছেন, যা ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা ‘কোগ্যাট’ কর্তৃক জারি করা। এছাড়া ১৯৫৭ সালের একটি মানচিত্রেও দেখা যায় যে, ফোয়ারা এবং পুলটি তাঁর জমির অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এ বিষয়ে কোগ্যাট বা ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। উল্টো স্মোটরিচ এই পুল সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য ৩০ লাখ শেকেল (ইসরায়েলি মুদ্রা) আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং পুলটির বাইরে ঝোলানো বিলবোর্ডেও তাঁর এই বিনিয়োগের কথা প্রচার করা হচ্ছে।
পুলের কাছে সাঁতার কাটতে আসা ২১ বছর বয়সী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ইয়েশাই শ্রাইবার দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেন, ইহুদিদের বড় দল এখানে আসার কারণে ফিলিস্তিনিরা এখন আর এখানে আসার সাহস পাবে না। তিনি আরও দাবি করেন, পশ্চিম তীর ইহুদিদের নিজস্ব ভূখণ্ড এবং ফিলিস্তিনিরা যদি ইহুদিদের কর্তৃত্ব মেনে না নেয়, তবে তাদের চলে যাওয়া উচিত। অন্যদিকে, কানাডাসহ কয়েকটি দেশের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী নেতা এলিয়াভ লিবি একটি ভিডিওতে দাবি করেছেন, এই পুলটি বাইবেল যুগের ইহুদি রাজা হেরোডের। তবে ইসরায়েলি অধিকার রক্ষা সংস্থা ‘ইমেক শেভ’–এর প্রত্নতাত্ত্বিক অ্যালন আরাদ জানান, পুলটির প্রকৃত ইতিহাস স্পষ্ট নয় এবং এভাবে পানি ঢোকানোর ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটির ক্ষতি হচ্ছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ফিলিস্তিনি অঞ্চলের অন্তত ১৬০টি পানি ও পয়োনিষ্কাশন কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। ফিলিস্তিনি মাঠগবেষক ফারেস ফোকাহা জানান, অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা এখন উত্তর জর্দান উপত্যকার ৯৫ শতাংশ ফোয়ারার দখল নিয়ে নিয়েছে, যার ফলে স্থানীয় ফিলিস্তিনিরা বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা আদেল ইয়াসিন এই পরিস্থিতিকে একটি ‘পানিযুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি এমন এক নীরব বুলেট, যা কোনো শব্দ ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ এছাড়া গত বৃহস্পতিবার পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামেও ফিলিস্তিনিদের বাড়ি ঘেরাও করে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
স্মোটরিচ স্পষ্ট জানিয়েছেন, এর লক্ষ্য হলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে মাটিচাপা দেওয়া।উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যদেশের মধ্যে ১৫০টির বেশি দেশ গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।জাতিসংঘ ও বেশির ভাগ দেশের সরকার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বসতিগুলোকে অবৈধ বলে মনে করে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে নেয়, তবে তারা এটিকে অধিকৃত অঞ্চল না বলে বিতর্কিত ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে।ফিলিস্তিনিরা অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান তীব্র সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে।