বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকা শাকসবজি থেকে শুরু করে চাল, ডাল, শিশুখাদ্য ও পানীয়তে মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতির ভয়াবহ চিত্র পাওয়া গেছে। এসব ভেজাল ও দূষিত খাবার জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মানুষকে অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজধানীর বাজার থেকে সংগৃহীত শাকসবজির নমুনায় সিসার মাত্রা স্বাভাবিক ০.৩ পিপিএমের বিপরীতে ২.৩৭ পিপিএম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এছাড়া এসব সবজিতে ই-কোলাই, ফিকাল কলিফর্ম ও সালমোনেলা জীবাণুর অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসা ও ক্যাডমিয়াম কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি করে এবং শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলা ও খাবারে নিষিদ্ধ রাসায়নিকের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। কক্সবাজার, মৌলভীবাজার ও বগুড়ার মরিচের গুঁড়ায় ক্যান্সার সৃষ্টিকারী নিষিদ্ধ কৃত্রিম রং 'সুদান ডাই (সুদান-১)' পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের একটি নমুনায় এর মাত্রা ১২৪২.৩২৪ পিপিএম পর্যন্ত ছিল, যা নিয়মিত গ্রহণে লিভার ও মূত্রথলির ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে। ডালডায় অনুমোদিত ২% সীমার বিপরীতে কুমিল্লায় ৩০.৯৮%, ভোলায় ২৩.৯৩% এবং পাবনায় ২০.৫৩% ট্রান্স ফ্যাট শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া মাখনে ৮.৪৪% এবং মার্জারিনে ১০.৭% ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া গেছে, যা হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। মুড়িতে ইউরিয়ার ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ; ঝালকাঠির মুড়িতে ৬৭৫৮.৭ মিলিগ্রাম ইউরিয়া পাওয়া গেছে। ফেনী, ঠাকুরগাঁও এবং সাতক্ষীরার মুড়িতেও উচ্চমাত্রায় ইউরিয়া মিলেছে, যা পাকস্থলীর প্রদাহ, আলসার এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল করতে পারে।

প্রক্রিয়াজাত খাবারেও রাসায়নিকের ছড়াছড়ি লক্ষ্য করা গেছে। সসে অনুমোদিত ৭৫০ পিপিএম সীমার বিপরীতে রংপুরের একটি নমুনায় ২৩২৭২ পিপিএম বেনজোয়িক অ্যাসিড পাওয়া গেছে। কুড়িগ্রাম ও ভোলার আচারেও ১০০০ পিপিএম সীমার বিপরীতে ৩০০০ পিপিএমের বেশি বেনজোয়িক অ্যাসিড মিলেছে। পানীয় জলের নমুনায় বাগেরহাট, দিনাজপুর ও খাগড়াছড়িতে ফেক্যাল কলিফর্মের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা মলমূত্র দূষণ নির্দেশ করে। দিনাজপুরের প্রতি ১০০ মিলিলিটার পানিতে ১২০ সিএফইউ এবং খাগড়াছড়ির ১০০ মিলিলিটার পানিতে ৬০ সিএফইউ ফেক্যাল কলিফর্ম শনাক্ত হয়েছে; বাগেরহাটে মিলেছে ৪৩ সিএফইউ। এছাড়া কর্তৃপক্ষের কার্যালয় থেকে সংগৃহীত মোরগ পোলাও, চিংড়ি ও ভাতে ই-কোলাই ও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে।

ভোজ্য তেলের গুণগত মানেও বড় ধরনের ত্রুটি ধরা পড়েছে। সরিষার তেলে লক্ষ্মীপুর থেকে সংগৃহীত নমুনায় ৫.৩ অ্যাসিড ভ্যালু পাওয়া গেছে, যেখানে সর্বোচ্চ সীমা ৩.০। এছাড়া সয়াবিন তেলে ভিটামিন 'এ'-এর ঘাটতি এবং অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ট্রান্স ফ্যাট (সর্বোচ্চ ৬.৬২%) পাওয়া গেছে। মধু, ঘি ও মিল্ক পাউডারেও কারসাজি ধরা পড়েছে; রাজবাড়ী ও চট্টগ্রামের ঘি’তে মিল্ক ফ্যাট অনুপস্থিত এবং বরিশাল থেকে সংগৃহীত মিল্ক পাউডারে সিসা শনাক্ত হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজীর আহমেদ জানিয়েছেন, খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ওপর জোর দিয়েছেন। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন, তবে ল্যাব ও লোকবল সংকট থাকায় কার্যক্রম সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে।