মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার পাশে সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া ব্যক্তিদের একজন ৩৫ বছর বয়সী নাটালি হার্প। দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত এই সহযোগী শুধু ট্রাম্পের নির্বাহী সহকারী হিসেবেই দায়িত্ব পালন করছেন না, তার ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট লেখাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছেন।

সম্প্রতি জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ ট্রাম্পের সমালোচনা করতে গিয়ে হার্পের নাম উল্লেখ করার পর তাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অসফ এক বক্তব্যে ‘নাটালিকে নিয়ে’ ট্রাম্পের কাতারের আমিরের দেওয়া নতুন বিমান ব্যবহারের প্রসঙ্গ তোলেন। তার মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়।

অসফের বক্তব্যে যে বিমানটির কথা বলা হয়েছে, সেটি নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ান হিসেবে আলোচিত। এর পাশাপাশি গত মাসে তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের গোপনে বিমান পরিবর্তনের সময় তার সঙ্গে অল্প কয়েকজনের মধ্যে হার্পও ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা হার্প একটি রক্ষণশীল খ্রিষ্টান পরিবারে বেড়ে ওঠেন। ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার শুরু মূলত নিজের ক্যানসার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা থেকে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ‘রাইট টু ট্রাই’ আইন পাস হয়। এই আইনের মাধ্যমে কিছু গুরুতর অসুস্থ রোগীকে পরীক্ষামূলক চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হার্প ওই আইনের সুবিধা নিয়ে পরীক্ষামূলক চিকিৎসা গ্রহণ করেছিলেন।

পরবর্তীতে ট্রাম্পকে নিজের জীবন রক্ষাকারী হিসেবে প্রকাশ্যে কৃতিত্ব দেন তিনি। ২০২০ সালের রিপাবলিকান ন্যাশনাল কনভেনশনে হার্প বলেছিলেন, বাজারে থাকা কেমোথেরাপিগুলো কাজ না করায় কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেই তাকে নেওয়া হচ্ছিল না। ট্রাম্পের উদ্যোগে পরীক্ষামূলক চিকিৎসার সুযোগ পাওয়ায় তিনি বেঁচে গেছেন বলে দাবি করেন হার্প। তার বক্তব্য ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ শিবিরে তাকে দ্রুত পরিচিত করে তোলে। ওই অনুষ্ঠানের পর ট্রাম্পও হার্পের প্রশংসা করেন।

২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প পরাজিত হওয়ার পর হার্প রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ওয়ান আমেরিকা নিউজ নেটওয়ার্কে (ওএএন) অনুষ্ঠান উপস্থাপনা শুরু করেন। সেখানে তিনি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিতি পান এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন এমন ভিত্তিহীন দাবির প্রচারেও যুক্ত ছিলেন। ২০২২ সালে ওএএন ছাড়ার পর তিনি ট্রাম্পের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় যোগ দেন। পরে ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে হোয়াইট হাউসে তার নির্বাহী সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পান।

হোয়াইট হাউসে তার আনুষ্ঠানিক পদ ‘এক্সিকিউটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট টু দ্য প্রেসিডেন্ট’। সাধারণত এ ধরনের পদে প্রেসিডেন্টের সময়সূচি, যোগাযোগ, সফর ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ সমন্বয়ের দায়িত্ব থাকে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনে হার্পের প্রভাব ও দৃশ্যমানতা আগের নির্বাহী সহকারীদের তুলনায় অনেক বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

হোয়াইট হাউসের সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে হার্পের একটি পরিচিতি হলো ‘হিউম্যান প্রিন্টার’। কারণ, তাকে প্রায়ই একটি বহনযোগ্য প্রিন্টার হাতে ট্রাম্পের পাশে দেখা যায়। ট্রাম্প যেসব নিবন্ধ, সংবাদ প্রতিবেদন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট পড়তে চান, সেগুলোর কাগজের কপি তার হাতে তুলে দেওয়ার কাজ করেন হার্প। ট্রাম্প ডিজিটাল কনটেন্টের চেয়ে অনেক সময় ছাপা কাগজে তথ্য পড়তে বেশি পছন্দ করেন বলে জানা যায়। হোয়াইট হাউসের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত এক সূত্রের মতে, এ কারণে প্রেসিডেন্ট কোন তথ্য বা আপডেট কখন পাচ্ছেন, সে ক্ষেত্রে হার্পের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। এ কারণেই হোয়াইট হাউসের ভেতরে ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমে তাকে কখনো ‘গেটকিপার’, আবার কখনো ‘কমফোর্ট ব্ল্যাঙ্কেট’ বা মানসিক স্বস্তির সঙ্গী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট তৈরিতেও হার্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ট্রাম্প যা বলতে চান, তা তিনি টাইপ করে পোস্ট করেন বলে জানা গেছে। ২০২৪ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের একটি বক্তব্য দেখার সময় ট্রাম্পের পাশে বসে হার্পকে তার হয়ে পোস্ট টাইপ করতে দেখা যায় এমন একটি ছবি সম্প্রতি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে দেখা যায়, ট্রাম্প কথা বলছেন এবং হার্প তার বক্তব্য ট্রুথ সোশ্যালে লেখার কাজ করছেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসের ভেতর ও বাইরে হার্পের উপস্থিতি প্রায় নিয়মিত। তাকে ওভাল অফিসে ট্রাম্পের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকতে কিংবা দেশ-বিদেশে সফরের সময় এয়ার ফোর্স ওয়ানে উঠতে দেখা যায়। হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র বিবিসিকে বলেন, ‘তিনি সবসময় আশপাশে থাকেন-আক্ষরিক অর্থেই সবসময়।’ সম্প্রতি তুরস্ক থেকে ট্রাম্পের গোপন বিমান পরিবর্তনের ঘটনায়ও হার্পের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের কাছ থেকে সম্ভাব্য হুমকির তথ্য পাওয়ার পর ট্রাম্প গোপনে বিমান পরিবর্তন করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ওই সময় অল্প কয়েকজনের সঙ্গে হার্পও বিমানে ছিলেন বলে জানা গেছে। সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি হার্পকে ট্রাম্পের ‘বিঙ্কি’ বা ‘কমফোর্ট ব্ল্যাঙ্কেট’-এর সঙ্গে তুলনা করেন অর্থাৎ এমন একজন, যার উপস্থিতি ট্রাম্পকে মানসিকভাবে স্বস্তি দেয়।

হার্পের ভাই প্রেস্টন হার্প সম্প্রতি সিএনএনকে বলেন, তাদের মা-বাবা যেসব বিষয়কে সম্মান করতে শিখিয়েছিলেন, ট্রাম্পের মধ্যে নাটালি সেসব বৈশিষ্ট্যই দেখতে পান। ছোটবেলা থেকেই হোয়াইট হাউসের প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল এবং ইরাক যুদ্ধের সময় সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশসহ আগের প্রেসিডেন্টদের কাছেও চিঠি লিখেছিলেন তিনি। ভাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসে কাজ করার সুযোগ পাওয়া ছিল হার্পের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। ট্রাম্পকে নিজের জীবন রক্ষাকারী মনে করার কারণে তার প্রতি হার্পের গভীর কৃতজ্ঞতাও রয়েছে।

ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিভিন্ন বই ও প্রতিবেদনে নানা দাবি উঠে এলেও হার্পের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে প্রকাশ্যে খুব বেশি তথ্য জানা যায়নি। এসব প্রতিবেদনের বেশিরভাগ তথ্যই বেনামি সূত্রের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত। সম্প্রতি হার্পকে নিয়ে আলোচনা বাড়ার পর হোয়াইট হাউস তাকে ট্রাম্প প্রশাসনের একজন ‘বিশ্বস্ত ও মূল্যবান’ সদস্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে ট্রাম্প নিজে প্রকাশ্যে খুব কমই তার এই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে নিয়ে কথা বলেছেন।

সব মিলিয়ে, একজন ক্যানসারজয়ী ট্রাম্প-সমর্থক থেকে প্রেসিডেন্টের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগীতে পরিণত হওয়া নাটালি হার্প এখন হোয়াইট হাউসের অন্যতম আলোচিত মুখ। তার আনুষ্ঠানিক পদ নির্বাহী সহকারী হলেও ট্রাম্পের পাশে তার প্রায় নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি এবং প্রেসিডেন্টের কাছে তথ্য পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা তাকে প্রশাসনের অভ্যন্তরে অন্য অনেক কর্মকর্তার তুলনায় বেশি দৃশ্যমান করে তুলেছে।