শৈশবে বাবার সঙ্গে ভারত হয়ে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১০ বছর। সেখানে বাবা-ছেলে জীবিকার সন্ধান করছিলেন। এরই মধ্যে পাকিস্তানে ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা হারান ফরিদ। কিছুদিন পর মানব পাচারকারীদের একটি চক্র তাঁকে তুরস্কে নিয়ে যায়। দীর্ঘদিন তাঁর খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সবাই ধরে নিয়েছিল, ফরিদের মৃত্যু হয়েছে। তবে সবাইকে চমকে দিয়ে ২৫ বছর পর দেশে ফিরেছেন তিনি।
ফরিদের বাড়ি কক্সবাজারের উখিয়ার মরিচ্যা পালং নাছির পাড়ায়। গত বৃহস্পতিবার তিনি দেশে ফেরেন। এরপর ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের সহায়তায় পরিবারের খোঁজ পান। ফরিদকে ঢাকায় তুলে দেওয়া হয় তাঁর ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কাছে। পরে তাঁকে কক্সবাজারে থাকা বৃদ্ধ মা নুরজাহান বেগমের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
ফরিদের ছোট ভাই সৈয়দ আলম উখিয়ার স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম। তিনি বলেন, ‘আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ ভাই আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাঁকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।’
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানে যাওয়ার পর ট্রেনে কাটা পড়লে চিকিৎসকেরা ফরিদের দুই পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। এর মধ্যে মানব পাচারকারী চক্র তাঁকে উন্নত জীবনযাপন ও চাকরির কথা বলে ইউরোপে নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখায়। একপর্যায়ে তাঁকে তুরস্কে নিয়ে যায়। সেখানে সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে আসছিলেন ফরিদ। বসবাস করছিলেন অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে। তবে সম্প্রতি তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
১৮ আগস্ট ভোর সোয়া পাঁচটার দিকে একটি ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। শৈশব থেকে বিদেশে থাকার কারণে তিনি ঠিকমতো নিজের পরিচয়ও দিতে পারছিলেন না। কেবল নিজের ও মা-বাবার নাম এবং ঠিকানা ‘উখিয়া, কক্সবাজার’—এটুকুই বলতে পেরেছেন।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) নিজস্ব এভিয়েশন সিকিউরিটি বা এভসেক (AVSEC) বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করেন। এরপর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় ১২ ঘণ্টার মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং নাছির পাড়ায় ফরিদের পরিবারের সন্ধান পান।
পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পর গত বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তাঁর ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। ফরিদের একটি হাতে পাঁচটির পরিবর্তে ছয়টি আঙুল রয়েছে। বাড়তি সেই আঙুল দেখে পরিবারের সদস্যরা ফরিদের পরিচয় নিশ্চিত হন। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফরিদের বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে রয়েছেন।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ‘গত আট বছরে বিমানবন্দরে আমরা ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দিতে পেরেছি। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জন প্রবাসীকে তাঁদের পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করতে সক্ষম হয়েছি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ। কিন্তু সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন অসম্ভবকেও সম্ভব করা গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তবে শুধু পরিবারের কাছে ফেরানো নয়, আমরা তাঁর জন্য দীর্ঘ মেয়াদে আরও কিছু করতে চাই, যাতে তিনি ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।’
মোহাম্মদ ফরিদকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রবাসীরা বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্ক তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।’