উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নির্ধারিত সময়ের আগেই শুক্রবার শেষ হয়েছে। মহড়ার মাত্র অর্ধেক কর্মসূচি সম্পন্ন হওয়ার পরই এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এবারের মহড়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ১৮ হাজার সেনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি আরও ১১টি মিত্র দেশের সামরিক সদস্যরা অংশ নিয়েছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে মহড়াটি ‘উত্তর কোরিয়ার প্রতি অনুপযুক্ত ও বৈরী’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যয়বহুল বলে উল্লেখ করে পেন্টাগনকে এর পরিসর ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার’ নির্দেশ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত তার মিত্রদেরও বিস্মিত করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো হিউন সিদ্ধান্তটিকে পারস্পরিক সমঝোতার ফল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও স্বীকার করেছেন, মহড়ার পরিসর কমানোর বিষয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আগে থেকে সিউলের কর্মকর্তারা অবগত ছিলেন না। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা যায়।

হঠাৎ করে মহড়া বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি জাপান ও তাইওয়ানের মতো দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব দেশ দীর্ঘদিন ধরে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে আসছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ গবেষক জো বি-ইউনের মতে, ট্রাম্পের একতরফা ও আকস্মিক সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ট্রাম্প ভবিষ্যতে দেশটিতে মার্কিন সেনার সংখ্যা আরও কমিয়ে দিতে পারেন। এমনকি উত্তর কোরিয়ার পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতিতেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।

দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ মহড়ার মধ্যেই উত্তর কোরিয়া সামরিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। মহড়া শুরুর কয়েক দিন আগে পিয়ংইয়ং জাপানের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে এবং হুমকি দিয়ে জানায়, দেশটির নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অধিকার তাদের রয়েছে।

এদিকে দুই কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো যুদ্ধে রয়েছে। কোরীয় যুদ্ধের পর কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটেনি। ২০২৪ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের দীর্ঘদিনের নীতিও পরিত্যাগ করেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এবারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যু ক্রমেই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়া। ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একইসঙ্গে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নিয়েও তার প্রশাসনের অভিযোগ রয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, দক্ষিণ কোরিয়া দেশটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করে, যা যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে সিউল ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখাচ্ছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বাণিজ্যিক বিরোধগুলো জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমানোর দাবি উঠেছে। সেজং ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট চেওং সিয়ং-চাং মনে করেন, দক্ষিণ কোরিয়ার উচিত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক জোট বজায় রাখার পাশাপাশি নিজস্ব পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের পদক্ষেপ নেওয়া।

দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের বড় একটি অংশ নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রের পক্ষে থাকলেও দেশটির সরকার এতদিন বলে এসেছে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা অপ্রয়োজনীয় এবং এটি দেশটির আন্তর্জাতিক জোটব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র আরও সরে গেলে এ অবস্থানে পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে মহড়া বন্ধের সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ নেতিবাচক হিসেবে দেখছে না সিউল। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গভীর বিবেচনার ফল হিসেবেই ট্রাম্প এই ‘সাহসী সিদ্ধান্ত’ নিয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের নেওয়া উচিত ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত বলেও জানান।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই সিউল তার অনিশ্চিত কূটনৈতিক কৌশলকে একই সঙ্গে ঝুঁকি ও সুযোগ হিসেবে দেখে আসছে। ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্যোগেই ট্রাম্প ও কিম জং উনের মধ্যে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে বৈঠকের পরই ট্রাম্প হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

২০১৯ সালে দ্বিতীয় বৈঠকে কিম উত্তর কোরিয়ার পুরো পারমাণবিক স্থাপনা পরিত্যাগ করতে রাজি না হওয়ায় কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়। ওই বছরের পরবর্তী সময়ে পানমুনজমে সংক্ষিপ্ত এক বৈঠক ছাড়া দুই নেতার মধ্যে আর কোনো উল্লেখযোগ্য আলোচনা হয়নি।

ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, কিম জং উনের সঙ্গে তার ‘দারুণ সম্পর্ক’ রয়েছে। বুধবারও তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সে আমাকে পছন্দ করে।’ ট্রাম্প চলতি বছরের শেষ দিকে কিমের সঙ্গে আবারও বৈঠক করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।

তবে কিমের বোন ও উত্তর কোরিয়ার প্রভাবশালী নেতা কিম ইয়ো জং ট্রাম্পের দাবিকে গুরুত্ব দেননি। তার ভাষ্য, ট্রাম্পের সঙ্গে কিমের সাম্প্রতিক যোগাযোগের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন, উত্তর কোরিয়া কখনোই তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করবে না।

যৌথ সামরিক মহড়ার পরিসর কমানোর বিষয়টিকেও উত্তর কোরিয়া গুরুত্ব দেওয়ার মতো ঘটনা হিসেবে দেখছে না বলে জানিয়েছেন কিম ইয়ো জং। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মহড়া ছোট করা হলেও এগুলোর ‘বৈরী ও আক্রমণাত্মক চরিত্র’ বদলায়নি।

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, চলতি বছর ট্রাম্প-কিম বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি পিয়ংইয়ংয়ের মূল দাবি উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি মেনে নেওয়ার মতো অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র এখনো যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারবার উত্তর কোরিয়াকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছেন না বললেও দেশটি সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে। উত্তর কোরিয়া এখন পর্যন্ত ছয়বার পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে সক্ষম দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও তাদের রয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে উত্তর কোরিয়া বিপুল পরিমাণ কামানের গোলা ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে বলে ধারণা করা হয়। একই সঙ্গে অন্তত ১৩ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা রাশিয়াকে সহায়তা করতে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এতে দেশটির সেনারা ড্রোনভিত্তিক আধুনিক যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।

এ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোট আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জো বি-ইউনের মতে, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে একা আত্মরক্ষার সক্ষমতা দক্ষিণ কোরিয়ার সীমিত। তাই সিউলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট ‘জীবন-মৃত্যুর বিষয়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।