বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঝকঝকে ইউনিফর্মের আড়ালে গড়ে উঠেছে আকাশপথে এক বিশাল হুন্ডি সিন্ডিকেট। জাতীয় পতাকাবাহী এই এয়ারলাইন্সের দুবাই স্টেশনে সংঘটিত নজিরবিহীন এই আর্থিক অপরাধের মাধ্যমে অন্তত শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ডিজিএফআই এবং বিমানের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে। কেবিন ক্রুদের বৈদেশিক বা ওভারসিজ ভাতা উত্তোলনের প্রচলিত নিয়মকানুন অমান্য করে একটি জালিয়াতচক্র এই অর্থ পাচারে সক্রিয় রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ১৪ মে জনতা ব্যাংক পিএলসি-এর দুবাই শাখা থেকে একটি মাত্র একক চেকের (নং-৯৪১৩২৬) মাধ্যমে ১৯৬ জন কেবিন ক্রুর বকেয়া ও ওভারসিজ ভাতা বাবদ ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহাম, যা প্রায় ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সমপরিমাণ, একবারে উত্তোলন করা হয়। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইমপ্রেস্ট অ্যাকাউন্ট থেকে ইস্যু করা এই চেকটি ফ্লাইট স্টুয়ার্ড এফএস শাকুরের (পিএন নং-৫১৫৪০) নামে ছিল। অভিযোগ রয়েছে, বিমানের অর্থ বিভাগের তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রচলিত পদ্ধতি উপেক্ষা করে এই সম্মিলিত অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন দেন এবং দুবাই স্টেশনের ফাইন্যান্স ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান এতে সহযোগিতা করেন। উত্তোলিত নগদ অর্থ সংশ্লিষ্ট ক্রুদের হাতে না দিয়ে দুবাইয়ে অবস্থানরত এক অবৈধ হুন্ডি এজেন্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এই জালিয়াতির নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালনকারী এফএস শাকুর দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত ‘মুরা/মৃদুলা মানি এক্সচেঞ্জ’-এর এজেন্ট নাজমুলের সঙ্গে অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে জড়িত। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ১৫ মে সকালে দুবাই থেকে ঢাকায় আসা বিজি-২৪৮ নম্বর ফ্লাইটের ক্রু শাকুরকে শাহজালাল বিমানবন্দরে তল্লাশি করা হয়। তার কাছে মাত্র ১০ হাজার মার্কিন ডলার ও ২ হাজার দিরহাম এবং অন্য ক্রুদের কাছে ৭৮ হাজার ৩৬০ দিরহাম পাওয়া যায়। বাকি প্রায় ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৭ দিরহাম বা ৪ কোটি ২৪ লাখ টাকার বিষয়ে শুরুতে ব্যাখ্যা দিতে না পারলেও পরে তিনি অর্থ হস্তান্তরের কথা স্বীকার করেন।
বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে গত দুই বছরের কারসাজির ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এফএস শাকুর ছাড়াও এই সিন্ডিকেটে আবু সালেহ, অংকুর ও শফিউল্লাহর মতো ক্রুরা জড়িত রয়েছেন বলে জানা গেছে। তারা নিয়মিত দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ রুটে ফ্লাইট শিডিউল হাতিয়ে নিয়ে এই অথরিটি বিলের মাধ্যমে গত দুই বছরে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। এর আগে ২২ এপ্রিল একই কায়দায় ১৬০ জন কেবিন ক্রুর প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার দিরহাম ইফতেখার আলমের নামে উত্তোলন করা হয়েছিল।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, কেবিন ক্রুদের মাধ্যমে হুন্ডির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর, কারণ তারা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। পুরো আর্থিক লেনদেনের চেইন অনুসন্ধান করা জরুরি। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে এফএস শাকুর তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুললেও ঘটনার সঙ্গে নিজের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।