যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ইসলাম ও মুসলিমবিদ্বেষ বা ইসলামফোবিয়া অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করেছে। মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং ঘৃণ্য অপরাধের অভিযোগ রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। গাজা যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে মুসলমানদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ইহুদি লবির ব্যাপক প্রভাব থাকায়, ইসরাইলবিরোধী যেকোনো বক্তব্য বা দৃষ্টিভঙ্গিকে মূলধারার রাজনীতিতে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়।
বর্তমান আমেরিকায় ‘ভালো মুসলিম’ হওয়ার একমাত্র শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে নীরব থাকা। কারণ ইসরাইলের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করলেই একজন মুসলমানকে অপবাদ, সন্দেহ ও একঘরে হওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ইসলাম ও আরব বিদ্বেষের কারণে বৈষম্য এবং হয়রানির অভিযোগ এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। রাজনৈতিক প্রচারণায় ইসলামবিরোধী বক্তব্য ও ভুল তথ্যের প্রচারের ফলে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিমরা প্রতিনিয়ত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান সিনেটর জন ম্যাককেইনকেও তার দলের কট্টর ইসলামবিদ্বেষী সমর্থকদের সামলাতে হয়েছিল। নির্বাচনের এক প্রচারণায় ওবামাকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা এক নারীকে থামিয়ে দিয়ে ম্যাককেইন তাকে একজন আমেরিকান নাগরিক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তবে বর্তমানের নির্বাচনি প্রচারণায় সেই বিদ্বেষ আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মিশিগানের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আব্দুল আল-সায়েদকে তার নামের কারণে ‘সমাজতন্ত্রী’ ও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আক্রমণ করা হয়েছে। রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ন্যান্সি মেস আল-সায়েদ ও নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানিকে ইঙ্গিত করে সরকারি পদে থাকা মুসলিমদের ‘ট্রোজান হর্স’ বা ছদ্মবেশী শত্রু আখ্যা দিয়েছেন। এছাড়া রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স গর্ব করে বলেছিলেন, তিনি সারা জীবন ‘সন্ত্রাসীদের শিকার’ করেই কাটিয়েছেন।
সিআইএর সাবেক পরিচালক মাইক পম্পেওর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আল-সায়েদকে ‘হামাস সমর্থক’ হিসেবে অভিহিত করে মুসলিমবিদ্বেষের পরিধি আরও বিস্তৃত করেছেন। এই বিদ্বেষ থেকে রেহাই পেতে আমেরিকান মুসলিমদের ইসরাইলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের শর্ত পূরণ করতে হয়, যা আল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী হ্যালি স্টিভেনসের ক্ষেত্রে কোনো বেগ পেতে হয়নি। নিও-কনজারভেটিভ চিন্তাবিদ রবার্ট কাগান স্বীকার করেছেন যে, আমেরিকা সামগ্রিকভাবে ইসলামবিদ্বেষী এবং অনেক আমেরিকানের কাছে ইসরাইলকে ইসলামের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে দেখা হয়।
এই বিদ্বেষ শুধু মুসলিমদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; ইসরাইলের সমালোচনা করলে ইহুদিরাও ‘বাজে ইহুদি’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। অ্যালান ডারশোভিটজ আল-সায়েদ ও মামদানির মতো প্রার্থীদের সমর্থনকারী ইহুদিদের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘আসল সমস্যাটা হলো ইহুদিরাই’। তার এই অবস্থানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি নিজেকে ওইসব ‘বাজে ইহুদি’র চেয়ে ‘অনেক বেশি কার্যকর ইহুদি নেতা’ হিসেবে দাবি করেছেন। এছাড়া বেহালাবাদক মাইকেল বারেনবোইম এবং ব্রিটিশ পত্রিকা ‘জুইশ ক্রনিকল’-এর মতো মাধ্যমগুলোও জায়নবাদ প্রত্যাখ্যানকারী ইহুদিদের প্রকৃত ইহুদি হিসেবে গণ্য না করার প্রবণতা লক্ষ্য করেছে। পশ্চিমা বিশ্বে বর্তমানে এই বার্তাটি অত্যন্ত জোরালো যে, ‘ভালো মুসলিম’ বা ‘ভালো ইহুদি’ হওয়ার জন্য ইসরাইলের প্রতি অবিচল আনুগত্য এবং ইসরাইলের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতাকারীদের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করা জরুরি।