কুষ্টিয়া সদর আসনের সংসদ সদস্য ও ইসলামী বক্তা মাওলানা আমির হামজা নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তার বিতর্কিত বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কুষ্টিয়ার দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। গত ১৭ বছর ধরে যে আসনে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব-উল আলম হানিফ ও তার ভাই আতাউর রহমান আতার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল, সেখানে এখন আমির হামজার দাপট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হানিফ ও আতা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও, আমির হামজা নিজেকে কুষ্টিয়া সদর আসনের আগামী পাঁচ বছরের প্রধানমন্ত্রী ও সরকার হিসেবে দাবি করছেন। গত ১৬ই আগস্ট কুষ্টিয়ায় এক প্রতিবাদ সমাবেশে তিনি বলেন, কুষ্টিয়া সদর আসনে আগামী পাঁচ বছর আমিই প্রধানমন্ত্রী। ডিসি, এসপি, ইউএনও নিরপেক্ষ না হলে কুষ্টিয়া থেকে তাদের বিদায় করে দেয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি। সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি তার নির্দেশনার ধরন এবং জনসমক্ষে নিজের গাড়িতে দেশীয় অস্ত্র বহনের বিষয়টিও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ১৫ই আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের ছয়রাস্তা মোড়ে আমির হামজার কটূক্তির প্রতিবাদে গণঅধিকার পরিষদের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে দলটির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাঁধে। সংঘর্ষের সময় আমির হামজার গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এর জেরে সন্ধ্যার পর এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে প্রায় ৩০ জন জামায়াত-শিবির কর্মী লাঠিসোটা, হকিস্টিক ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে গণঅধিকার পরিষদের জেলা কার্যালয়ে তাণ্ডব চালায়। হামলায় কার্যালয়ের আসবাবপত্র, কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম ধ্বংস করা হয় এবং কার্যালয়ের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
এই ঘটনার পর থেকে গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। দলটির জেলা ও ছাত্র অধিকার পরিষদের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, জামায়াত-শিবির কর্মীরা তাদের প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। ছাত্র অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ সবুজ ও সভাপতি খন্দকার হাদিউর রহমান তনয়সহ ২৪ জন নেতাকর্মী হামলার ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সোহান আহমেদ তুফান নামের এক ছাত্রনেতার নাক ও হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আমির হামজা অবশ্য তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত দাবি করে এর জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। তিনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী দাবির বিষয়টিকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করেছেন এবং সাফাই গেয়েছেন যে, তিনি কুষ্টিয়ায় কোনো দখলদারি বা চাঁদাবাজি প্রশ্রয় দেবেন না। গাড়িতে দেশীয় অস্ত্র বহনের বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, নিরাপত্তার খাতিরে তিনি একটি বেসবল ব্যাট বহন করেন। এ ছাড়া আরেক বক্তৃতায় আমির হামজা বলেছিলেন- তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু জাবি প্রশাসন জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১১ সালে জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ চালু হয়। সুতরাং আমির হামজা এই বিভাগে ভর্তি হওয়ার যে তথ্য প্রকাশ করেছেন তা সত্য নয়।
এদিকে কুষ্টিয়া বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলেও তারা শহরে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। কুষ্টিয়া সদর আসনে বিএনপি’র ঘাঁটিতে ৬৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজয়ের নেপথ্যে চারটি কারণ উল্লেখ করে স্থানীয় নেতারা বলেন, নির্বাচনের আগে কুষ্টিয়া ডিসি-এসপিসহ পুরো প্রশাসন জামায়াতপন্থিদের দিয়ে সাজানো হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, বিএনপি’র একটি গ্রুপ দলের বিপক্ষে কাজ করেছে। তৃতীয়ত, আমির হামজা জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা হওয়ায় এলাকার ধর্মভীরু মানুষের মধ্যে তার প্রভাব ছিল। চতুর্থত, কুষ্টিয়া বিএনপিতে চারটি গ্রুপ রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কুষ্টিয়ায় জামায়াত-শিবির ও গণঅধিকার পরিষদের পাল্টাপাল্টি মামলার কারণে শহরটিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে।