প্রতিরক্ষা উৎপাদনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোর একটি বেসরকারি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করার বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও)’র তৈরি সব প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি ভারতীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছেন। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মঙ্গলবার এ তথ্য জানিয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে এতদিন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগারের আধিপত্য থাকা এই খাতে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট কারিগরি যোগ্যতা, সার্টিফিকেশন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বেসরকারি কোম্পানিগুলো এসব প্রযুক্তি ব্যবহার ও উৎপাদনের অধিকার পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের দাবি, এর লক্ষ্য হলো ক্ষেপণাস্ত্রের গবেষণা ও উন্নয়ন থেকে ব্যাপক উৎপাদনে দ্রুত যাওয়া, দেশে উৎপাদন বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, এর উদ্দেশ্য হলো দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য প্রযুক্তি অংশীদারকে সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা। এর মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার উন্নয়ন পর্যায় থেকে শিল্পভিত্তিক উৎপাদনে সফলভাবে রূপান্তর ঘটানো সম্ভব হবে। ব্যাঙ্গালোরভিত্তিক তক্ষশিলা ইনস্টিটিউশনের গবেষক আদিত্য রামানাথনের মতে, এই সিদ্ধান্তের আওতা বেশ বিস্তৃত। এর মধ্যে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি রেডিয়েশন মিসাইল, অ্যান্টি ট্যাংক ব্যবস্থা এবং ল্যান্ড অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইলের মতো ভারী অস্ত্রও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এতদিন ডিআরডিওর তৈরি অস্ত্র ব্যাপক পরিসরে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারত মূলত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভারত ডায়নামিকস দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে প্রায় একচেটিয়া অবস্থানে ছিল। রামানাথনের মতে, মঙ্গলবারের ঘোষণা সেই একচেটিয়া ব্যবস্থা ভাঙার কারণে বড় পরিবর্তন। বেসরকারি কোম্পানিগুলো বহু বছর ধরেই ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করছে। তবে নতুন সিদ্ধান্তের ফলে তারা সরবরাহব্যবস্থার আরও ওপরের স্তরে উঠে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রধান সমন্বয়কারী বা নির্মাতা হতে পারবে। ভারত এখন নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর অনেকটাই নির্ভর করলেও রাশিয়া ও ইসরায়েলের কাছ থেকেও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র আমদানি করে।
মোদি সরকারের আমলে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির আওতায় প্রতিরক্ষা খাতে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে দুই সীমান্তেই নিরাপত্তা অনিশ্চয়তা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে ভারত গত এক দশকে প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট ছিল প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার, বর্তমান অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের প্রতিরক্ষা বাজেট আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। রামানাথনের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধ এবং গত বছরের সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতাও ভারতের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের মজুত প্রয়োজন হবে, কারণ সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলো দেখিয়েছে যে অস্ত্রের মজুত খুব দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। চীনকে সবচেয়ে সক্ষম প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে ভারত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ভয়াবহ যুদ্ধে আঘাত হানা এবং আঘাত সহ্য করার সক্ষমতা অর্জনের জন্য তিন বাহিনীকে নিয়ে একটি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীও গড়ে তুলছে।
ভারতীয় বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। জুনে ভারত দেশীয় নির্মাতাদের কাছ থেকে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সামরিক ড্রোন কেনার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। দেশটির ড্রোন শিল্পে আদানি, লারসেন অ্যান্ড টুব্রো ও টাটা অ্যাডভান্সড সিস্টেমসের মতো বড় প্রতিষ্ঠানসহ ৬০০টিরও বেশি কোম্পানি যুক্ত রয়েছে। জুলাইয়ে ভারত ৫ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও কামিকাজে ড্রোনও রয়েছে। ভারত একই সঙ্গে নৌবাহিনীর দ্রুত আধুনিকায়নের চেষ্টা করছে। চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে ডিসেম্বরে অন্তত ৭৫টি জাহাজ ও সাবমেরিন সংগ্রহের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
ভারতের বড় বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলো গত কয়েক বছরে গোলাবারুদ, ড্রোন, মহাকাশ প্রযুক্তি ও সামরিক ইলেকট্রনিকসে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ২০২৪ সালে উত্তর প্রদেশে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানায় ৩০ বিলিয়ন রুপির বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। তবে রামানাথনের মতে, শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকার বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে কত বড় অর্ডার দেয় তার ওপর। ভারতের হাতে বিভিন্ন ধরনের ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের বার্ষিকীতে ভারত অগ্নি-৫ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালায়। এটি ভারতের সবচেয়ে উন্নত পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি, যার পাল্লা প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মসের মতো শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রও ভারতের হাতে রয়েছে, যার পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার।
বেসরকারি কোম্পানিগুলো কি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম?ভারতের বড় বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীগুলো গত কয়েক বছরে গোলাবারুদ, ড্রোন, মহাকাশ প্রযুক্তি ও সামরিক ইলেকট্রনিকসে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। সম্প্রতি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অবকাঠামো তৈরিতেও বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। ভারতীয় শিল্পপতি গৌতম আদানির মালিকানাধীন আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ২০২৪ সালে উত্তর প্রদেশে গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানায় ৩০ বিলিয়ন রুপির বেশি- প্রায় ৩১৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এসব স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল-নির্দেশিত গোলাবারুদের বিস্ফোরক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও থাকার কথা। তবে শুধু বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যায় না। রামানাথনের মতে, শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকার বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে কত বড় অর্ডার দেয় তার ওপর।