একটি মানচিত্র, পুরোনো বাড়ির দরজার ভাঙা কাঠ, দাদির হাতের কাদার পাত্র কিংবা জলপাই গাছের ছায়া—দেশকে মানুষ নানাভাবে স্মৃতিতে বয়ে বেড়ায়। কিন্তু যখন আর কোনো উপায় থাকে না, তখন মানুষ তার নিজের শরীরের ভেতরেই ধারণ করে নেয় স্বদেশকে। ফিলিস্তিনি চিত্রশিল্পী সুলেইমান মানসুরের চিত্রকর্মগুলোর দিকে তাকালে এই সত্যটিই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। আপাতদৃষ্টিতে তাঁর ক্যানভাসে মানুষ, নারী, গাছ, উট, শান্ত সকাল কিংবা দূরের আকাশ আঁকা মনে হলেও, একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় তিনি আসলে একটি ভূখণ্ডকে মানুষের স্মৃতির মণিকোঠা থেকে হারিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর শিল্পে মানুষ আর মাটি কোনো আলাদা সত্তা নয়।

মানসুরের আঁকা ‘মাদারহুড’, ‘কোয়ায়েট মর্নিং’, ‘দ্য ক্যামেল/ক্যারিয়ার অব হার্ডশিপস’, ‘দ্য ফ্লাইট টু ইজিপ্ট’, ‘শ্রিঙ্কিং অবজেক্ট’, ‘সেটলমেন্ট’, ‘পার্সিভিয়ারেন্স অ্যান্ড হোপ’, ‘গাজা’, ‘স্যাড টিউন’ এবং ২০২১ সালের ‘ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি’—এই কাজগুলোকে আলাদাভাবে দেখা গেলেও, এগুলো আসলে একটি দীর্ঘ ও অসমাপ্ত বাক্যের মতো। যে বাক্যের শুরু হয়তো ১৯৪৮ সালের নাকবারও আগে, আর যার শেষ কোথায় তা আজও কেউ জানে না। জলপাই, কমলা, নারী, মা, গ্রাম, শহর, ঐতিহ্যবাহী পোশাক আর অপেক্ষার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে তাঁর ছবির ফিলিস্তিনি পরিচয়। রাজনীতি যেখানে মানুষের জীবনে আঘাত হানে, মানসুরের শিল্প সেখানে জীবনের ক্ষুদ্রতম চিহ্নগুলোকে পরম মমতায় ধরে রাখে।

শিল্পীর তুলিতে ‘মা’ কখনো কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং তিনি মাতৃভূমি ও বিপ্লবের প্রতীক। ‘মাদারহুড’ ছবিতে মাতৃত্ব ব্যক্তিগত সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে এক সামষ্টিক রূপ ধারণ করে। মা যেমন সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, মানুষও তেমনি দেশকে বহন করে স্মৃতির অতল গভীরে। মানসুরের ছবির নারীরা দুর্বল নন; তাঁদের অবয়বে রয়েছে কাজের শক্তি, পোশাকে ইতিহাসের গৌরব আর নীরবতায় লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ প্রতিরোধ। তাঁরা কেবল অপেক্ষা করেন না, বরং ঐতিহ্য ও অস্তিত্বকে রক্ষা করেন।

মানসুরের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি ‘দ্য ক্যামেল/ক্যারিয়ার অব হার্ডশিপস’-এ দেখা যায় এক ক্লান্ত বৃদ্ধকে, যিনি নিজের পিঠে জেরুজালেম শহরকে বহন করছেন। সাধারণত শহর মানুষকে আশ্রয় দেয়, কিন্তু এখানে মানুষই শহরকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছে। ইতিহাসের নির্মম ট্র্যাজেডি, নির্বাসন আর স্মৃতির অসীম ভার নিয়ে এই বৃদ্ধের অত্যন্ত ধীরগতির যাত্রাই মানসুরের শিল্পের মূল চালিকাশক্তি—যেকোনো পরিস্থিতির মধ্যেও ভার নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।

১৯৭৬ সালে আঁকা ‘পার্সিভিয়ারেন্স অ্যান্ড হোপ’ ছবিতে ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি পোশাক পরা হাত বাঁধা তিনটি মানুষকে আকাশের একটি পাখির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। পেছনে ধ্বংসস্তূপের মাঝেও ওপরের পাখিটি এখানে শান্তি ও আশার প্রতীক। হাত বাঁধা থাকলেও তাঁদের চোখ খোলা, যা ইঙ্গিত করে যে মানুষের শরীরকে বন্দি করা গেলেও তার দৃষ্টি ও স্বপ্নকে আটকে রাখা অসম্ভব। এখানে আশা মানে সস্তা আনন্দ নয়, বরং সবকিছু ধ্বংস হওয়ার পরও ভেঙে না পড়ার জেদ।

ফিলিস্তিনিদের এই অবিচল টিকে থাকার লড়াই বা ‘সুমুদ’ (Sumud)-এর ধারণাটি ফুটে উঠেছে ‘কোয়ায়েট মর্নিং’ ছবিতে। ফিলিস্তিনের ইতিহাসে কোনো সকালই পুরোপুরি শান্ত নয়, কারণ প্রতিটি শান্ত আলোর পেছনে থাকে বিগত রাতের চেকপয়েন্ট, বাড়ি হারানোর বেদনা আর আগামী মুহূর্তের অনিশ্চয়তা। তবু এই শান্ত সকালের বার্তা হলো—আমরা আজও জেগে উঠেছি, আজও আমরা আমাদের মাটিতে টিকে আছি।

আবার ‘দ্য ফ্লাইট টু ইজিপ্ট’ ছবিতে মাতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উদ্বাস্তু জীবন ও আশ্রয়ের প্রশ্ন। রাষ্ট্র যখন নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, ঘর যখন আর নিরাপদ থাকে না, তখন মায়ের কোলই হয়ে ওঠে একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। মা সন্তানকে আঁকড়ে ধরেন, মাটি ধরে রাখে মানুষকে, আর মানুষ আঁকড়ে থাকে মাটিকে—এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের এক অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি হয় মানসুরের ক্যানভাসে।

প্রথম ইন্তিফাদার সময় ইসরায়েলি শিল্পসামগ্রী বর্জনের ডাক দিয়ে মানসুর প্রচলিত ক্যানভাস ছেড়ে ফিলিস্তিনের নিজস্ব মাটি, কাদা, খড় ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার শুরু করেন। ‘শ্রিঙ্কিং অবজেক্ট’ ছবিতে কাদার ফাটলগুলোকে তিনি ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক বিভাজনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। শুকিয়ে যাওয়া কাদার ফাটল কোনো ত্রুটি নয়, বরং এটাই হয়ে ওঠে ছবির ভাষা ও মানচিত্র। মাটি সংকুচিত হওয়ার সাথে সাথে মানুষের শরীর ও অস্তিত্বও সংকুচিত হতে থাকে, যার শেষ সীমানায় পড়ে থাকে কেবল মাটি ও স্মৃতি।

সহিংসতার অন্য এক রূপ দেখা যায় ‘সেটলমেন্ট’ ছবিতে, যেখানে বসতিস্থাপনকারীদের শরীর কাঁটাতারের সাথে মিশে গেছে। শিল্পী নিজেই জানিয়েছেন, কাঁটাতারের লাল রঙটি রক্ত নয়, বরং মরিচা। কাঁটাতার, সৈনিক আর জমি যখন একাকার হয়ে যায়, তখন প্রতিদিনের সহিংসতা মানুষের কাছে স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে ওঠে, যা এই ছবির সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। অন্যদিকে, ‘গাজা’ একটি ভূখণ্ডের নাম ছাড়িয়ে অবরুদ্ধ জীবন ও বেঁচে থাকার এক চিরন্তন লড়াইয়ের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘স্যাড টিউন’ ছবিতে বিষণ্ন সুর শেষ হলেও তার প্রতিধ্বনি যেমন থেকে যায়, তেমনি ফিলিস্তিনের দুঃখ ও হারানোর স্মৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এক উত্তরাধিকার হিসেবে প্রবাহিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় না থেকে প্রতিরোধে রূপ নেয়।

২০২১ সালের তেলচিত্র ‘ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি’ ছবিতে দেখা যায় এক নারী একটি গাছকে জড়িয়ে ধরে আছেন, যার এক শাখায় জলপাই আর অন্য শাখায় কমলা ঝুলছে। ফিলিস্তিনি পরিচয় ও কৃষির সাথে যুক্ত এই দুই ফলের শাখা আলাদা হলেও তাদের শিকড় এক ও অভিন্ন। এই শিকড়ই প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক বিভাজন যতই থাকুক না কেন, মাটির গভীরের সংযোগকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত সুলেইমান মানসুরের শিল্প এক চিরন্তন যাত্রীর গল্প বলে, যে বারবার ফিরে আসে তার মায়ের কাছে, জলপাই গাছের ছায়ায়, জেরুজালেমের মাটিতে। হাত বাঁধা থাকলেও চোখ খোলা রেখে একাকী বৃদ্ধের মতো অত্যন্ত ধীরে হলেও সে হেঁটে চলে তার নিজের গন্তব্যের দিকে।