দেশের চলমান গ্যাস-সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহস্বল্পতা। একই সময়ে দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় এবং কিছু কেন্দ্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ চলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ও জনভোগান্তি দুই-ই বেড়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ৬২টির উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল এবং বাকিগুলো সীমিত সক্ষমতায় চলেছে। ফলে ওই দিন দিনের বেলাতেই সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। তবে গত বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট, যার বিপরীতে সরবরাহ করা গেছে ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, অর্ধেকেরও বেশি উৎপাদন সক্ষমতা অলস বসিয়ে রাখতে হয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে গ্যাস-সংকটের কারণে ৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করা যাচ্ছে না। শিল্প খাতে সরবরাহ বাড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের জোগান কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও গত বৃহস্পতিবার ২৪টি কেন্দ্রে জ্বালানি তেলের সরবরাহস্বল্পতা ছিল।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, দুটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি করে ইউনিটে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে পটুয়াখালীর পায়রা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রাখতে হয়েছে। পাশাপাশি বড়পুকুরিয়া কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটেও কারিগরি ত্রুটি রয়েছে। ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। সেটি দিনের বেলায় ৯০০ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ও রাতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। তিনি আরও জানান, তেলচালিত কেন্দ্রগুলো চাইলেই সব সময় পুরো সক্ষমতায় চালানো যায় না, মাঝেমধ্যে বিরতি দেওয়ার কারণে অর্ধেক সক্ষমতা ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ ঘাটতি আরও বাড়িয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও দেশীয় ক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন কমতে থাকায় সাধারণত ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে ১০৫ কোটি ঘনফুট পাওয়ার কথা থাকলেও গত বৃহস্পতিবার পাওয়া গেছে ৭৪ কোটি ঘনফুটের কম। ফলে ওই দিন মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল ২৩৫ কোটি ঘনফুট। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে এক্সিলারেটের টার্মিনালটি গত ২১ জুলাই এক অগ্নিকাণ্ডে বন্ধ হয়ে যায়। গত ১৫ আগস্ট এটি সচল হলেও নির্ধারিত সময়ে এলএনজি কার্গো না পৌঁছানোয় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়নি। গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বাড়তে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

জ্বালানি খাতের এই সংকটের বিষয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সংকটের মধ্যেও সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, অযোগ্য জাহাজে এলএনজি আমদানি এবং চীনের অনভিজ্ঞ কোম্পানির সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মতো ঘটনা ঘটছে। এসবের কারণে সংকট উত্তরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তিনি মনে করেন, কাঠামোগত সংস্কার না হলে এই খাতের অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা ও চুরি বন্ধ হবে না এবং সংকটও কাটবে না।

এদিকে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম জানান, ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সক্ষমতায় চলেছে। পরবর্তীতে বকেয়া বাড়তে থাকায় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয় এবং লোডশেডিং বাড়তে থাকে। পিডিবির সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়াজনিত বিরোধ নিষ্পত্তি করা গেলে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন। সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় বর্তমানে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো রাতে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট এবং দিনে দেড় থেকে দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত চালানো হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

লোডশেডিংয়ের তীব্র প্রভাব পড়েছে ঢাকার বাইরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এলাকাগুলোতে। আরইবির ৮০টি সমিতির মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। আরইবি সূত্রে জানা গেছে, সরবরাহ ঘাটতির কারণে একই এলাকায় বারবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গত বুধবার রাত ১২টায় সারা দেশে মোট ২ হাজার ৮২৮ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের মধ্যে আরইবি এলাকাতেই লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৪৭০ মেগাওয়াট।

ঢাকার দুই বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসি জানিয়েছে, তারা ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। সে অনুযায়ী রাত ১১টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৫০ মেগাওয়াট, সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট এবং দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ২০০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে সরবরাহের তারতম্যের কারণে এই পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা জালোওয়াশান আখতার খান ও যাত্রাবাড়ী বিবির বাগিচার বাসিন্দা শর্মিলা শর্মি জানান, দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্যাস না থাকায় এলপিজি সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে, যাতে একদিকে যেমন লিফটে আটকে পড়ার ভয় কাজ করছে, অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বহুগুণ বেড়ে গেছে।

ওই দিন ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হয়েছিল।