প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০: ২৪ আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১০: ২৭
মদীনার এক অন্ধকার রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি চিঠি লিখিয়েছিলেন, যা উটের পিঠে চড়ে মাসের পর মাস পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছেছিল পারস্যের রাজদরবারে কিংবা রোমের সীমান্তে। সেই চিঠির একটি বাক্যই ছিল গোটা একটি সাম্রাজ্যের বিশ্বাস কাঠামো নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আজ সেই একই বার্তা এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে পৌঁছে যেতে পারে পৃথিবীর প্রান্তে থাকা কোটি মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্ক্রিনে। মাধ্যম বদলালেও দাওয়াহর মূল দায়িত্বের পরিধি বরং আরও বিশাল ও জটিল হয়েছে।
দাওয়াহ ইসলামের কোনো ঐচ্ছিক কার্যক্রম নয়, এটি দ্বীনের হৃৎপিণ্ড। পবিত্র কোরআনের সূরা আলে ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও এবং অসৎকাজে নিষেধ করো।' এই আয়াতে দাওয়াহর কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যম নির্ধারণ করা নেই। সাহাবিদের যুগে ছিল মুখে কথা ও চিঠি, তাবেইদের যুগে বই ও গ্রন্থাগার, উসমানীয় যুগে ছাপাখানা, আর বর্তমান যুগে স্মার্টফোন আজ মসজিদ, লাইব্রেরি ও ক্লাসরুমের বিকল্প হিসেবে কাজ করছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও তার সময়ের কার্যকর যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেছিলেন। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় লেখক নিয়োগ, রাষ্ট্রনায়কদের কাছে দূত প্রেরণ এবং যুদ্ধবন্দিদের থেকে শিক্ষাদানের বিনিময়ে মুক্তির ব্যবস্থা ছিল সেই সময়ের আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের উদাহরণ। আজকের দাঈর সামনে সুযোগ অসীম; একটি ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, অজানা ভাষার বই মুহূর্তেই অনুবাদ হয়ে যায় এবং সংশয়গ্রস্ত মানুষ অজ্ঞাতনামা পরিচয়েও প্রশ্ন করে সমাধান পেতে পারে।
তবে এই ডিজিটাল সমুদ্রে রয়েছে বিপজ্জনক ঘূর্ণিপাক। প্রযুক্তি যেমন সত্যকে দ্রুত ছড়ায়, তেমনি মিথ্যাকেও সমান গতিতে ছড়িয়ে দেয়। জনপ্রিয়তার লোভে বার্তার গভীরতা বিসর্জন দেওয়া বর্তমান সময়ের দাঈদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক, শেয়ার ও ভিউয়ের সংখ্যা অজান্তেই ইখলাস বা একনিষ্ঠতাকে বিষাক্ত করে তুলতে পারে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যারা মানুষকে দেখানোর জন্য ইলম শিক্ষা দেয়, তাদের পরিণতি হবে ভয়াবহ। তাই প্রতিটি দাঈর উচিত নিজের নিয়ত নিয়মিত যাচাই করা।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয়নবী (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন, 'তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান করো হিকমত ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে, আর তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো এমনভারে যা সর্বোত্তম।' (সুরা নাহল : ১২৫)। ডিজিটাল জগতে হিকমাহর অর্থ কেবল মিষ্টি কথা বলা নয়; বরং এর অর্থ হলো শ্রোতার প্রেক্ষাপট বোঝা, তার প্রশ্নের পেছনের যন্ত্রণা অনুধাবন করে হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া। ইন্টারনেটের অসংখ্য কোণে ইসলামকে রাগ, তাচ্ছিল্য বা ভিন্নমতের প্রতি কঠোর ভাষায় উপস্থাপন করা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে দাওয়াহর বিপরীত কাজ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যাকে কোমলতা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাকে সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত করা হয়।'
প্রযুক্তির কল্যাণে যে কেউ এখন দ্বীনের মুখপাত্র হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে, যা জ্ঞান ও মতামতের সীমারেখা মুছে দিচ্ছে। অগভীর জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ জটিল ফিকহি বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, যা প্রকৃত আলেমদের বহু বছরের অধ্যয়নকে অবহেলা করে। তাই উৎস যাচাইয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিশেষে, প্রযুক্তি কেবল একটি হাতিয়ার মাত্র; এটি কখনোই মানুষের হৃদয়ের স্পর্শের বিকল্প হতে পারে না। ডিজিটাল মাধ্যম হতে পারে প্রথম দরজা, আর মানবিক সম্পর্কই ঈমানের গভীরে পৌঁছানোর আসল উপায়।