খোরাসান অঞ্চলের প্রাচীন জনপদ নিশাপুর দীর্ঘ ছয় শতাব্দী ধরে মুসলিম ইতিহাস, সভ্যতা, জ্ঞান ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। আব্বাসীয় যুগে বাণিজ্য ও জনবসতির জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠা এই শহরটি পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। ৫৪০ হিজরিতে (১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে শহরটি ধ্বংসের মুখে পড়ে। এরপর ঘুজ উপজাতি এবং পরবর্তীতে ৬১৮ হিজরিতে (১২২১ খ্রিষ্টাব্দ) মঙ্গোলদের ভয়াবহ আক্রমণের কারণে এর ধ্বংসযজ্ঞ পূর্ণতা পায়। তাহিরি শাসকদের সময়ে নিশাপুর খোরাসানের রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছিল। ইবনু হাওকাল তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন, তাহিরিরা কেন্দ্র স্থানান্তর করার পর এই শহরের আবাদ, আয়তন ও সম্পদ অনেক বৃদ্ধি পায় (সুরাতুল আরদ, পৃষ্ঠা ৪৩৬–৪৩৭)। তবে সেলজুক যুগে ঘুজদের আক্রমণ এবং পরবর্তীতে ৬১৮ হিজরিতে মঙ্গোল বাহিনী খোরাসানে প্রবেশ করলে নিশাপুর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মুখে পড়ে, যার বিবরণ পাওয়া যায় আল-কামিল ফিত তারিখ গ্রন্থে (আল-কামিল ফিত তারিখ, ১২/৩৬৩–৩৬৫)।
একটি শহরের পরিচয় সাধারণত তার রাজপ্রাসাদ কিংবা ব্যস্ত বাজারে প্রকাশ পায়। কিন্তু নিশাপুরের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে ছিল তার মসজিদের দারসবাড়িতে, মুহাদ্দিসদের মুখরিত মজলিশে এবং পাণ্ডুলিপিতে ভরা সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারে। খোরাসানের এই নগরী একসময় এমন এক অনন্য জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে দূরদূরান্ত থেকে শিক্ষার্থী ও আলেমরা সমবেত হতেন। বিখ্যাত ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাবি নিশাপুরকে খোরাসানের অন্যতম সমৃদ্ধ নগর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এই শহরটি ছিল গুণীজন ও পণ্ডিতদের মূল উৎস (মু’জামুল বুলদান, ৫/৩৩১–৩৩৩)। নিশাপুরের প্রকৃত মহত্ত্ব কেবল তার ভূগোলে ছিল না, বরং তা ছিল সেখানে গড়ে ওঠা সুদীর্ঘ জ্ঞান-পরম্পরায়।
নিশাপুরের বুদ্ধিবৃত্তিক গুরুত্ব বোঝার জন্য এই একটি বিষয়ই যথেষ্ট যে, শহরটির আলেমদের জীবন ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে আলাদা ইতিহাসগ্রন্থ রচিত হয়েছিল। সাধারণত কোনো শহরের ইতিহাসে শাসকদের নাম বেশি জায়গা পেলেও নিশাপুরের ক্ষেত্রে আলেমদের নামই হয়ে উঠেছে শহরের ইতিহাসের প্রধান উপাদান। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-হাকিম নিশাপুরী ৩২১ হিজরিতে নিশাপুরে জন্মগ্রহণ করেন। হাদিসশাস্ত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি নিশাপুরের আলেমদের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর রচিত তারিখু নিশাপুর ছিল এই নগরের আলেমদের জীবন ও জ্ঞানচর্চার একটি সুবৃহৎ দলিল (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৭/১৬৩–১৬৫)।
হাফিজ হাকিমের জীবন নিশাপুরের জ্ঞান-পরিবেশের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ইমাম জাহাবি তাঁর জীবনীতে উল্লেখ করেছেন যে, আল-হাকিম প্রায় দুই হাজার শায়খের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করেছিলেন (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৭/১৬৩–১৬৪)। একজন আলেমের শিক্ষাজীবনে একটি শহরেই এত বিপুলসংখ্যক শায়খের উপস্থিতি থাকলে সেই শহরের জ্ঞানচর্চার ব্যাপ্তি সহজেই অনুমান করা যায়। নিশাপুরে হাদিস শেখা ছিল এক দীর্ঘ পরম্পরা, যেখানে একজন ছাত্র শায়খের কাছ থেকে শুনে অন্য শায়খের কাছে যেতেন এবং আবার ফিরে এসে নিজের অর্জিত জ্ঞান পরবর্তী ছাত্রদের কাছে পৌঁছে দিতেন।
নিশাপুরের এই সমৃদ্ধ জ্ঞান-ঐতিহ্য কেবল আল-হাকিমের মধ্যেই থেমে থাকেনি। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত ছাত্র ছিলেন ইমাম আবু বকর আল-বাইহাকি। তিনি হাকিমসহ বহু মুহাদ্দিসের কাছ থেকে জ্ঞান গ্রহণ করেন (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৮/১৬৩–১৭০)। পরবর্তী সময়ে বাইহাকি হাদিসশাস্ত্রের অন্যতম প্রধান ইমামে পরিণত হন। তাঁর রচিত আস-সুনানুল কুবরা ও শু‘আবুল ইমানসহ বিভিন্ন গ্রন্থ মুসলিম জ্ঞান-ঐতিহ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। হাকিমের জ্ঞান তাঁর ছাত্রদের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছিল এবং বাইহাকি সেই জ্ঞানকে আরও বিস্তৃত করেছিলেন, যার মাধ্যমে একটি শহরের জ্ঞান তার ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে যায়।
পঞ্চম হিজরি শতকে নিশাপুরের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস এক নতুন মোড় নেয়। এই পরিবেশেই আবির্ভূত হন আবুল মা‘আলি আবদুল মালিক ইবনে আবদুল্লাহ আল-জুওয়াইনি। তিনি নিশাপুরকে তাঁর জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বানিয়েছিলেন (তাবাকাতুশ শাফেয়িয়াতিল কুবরা, ৫/১৬৫–১৬৬)। আল-বুরহান ও আল-ইরশাদ গ্রন্থে ইসলামি জ্ঞানকে তিনি একই বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে দেখেছেন। একপর্যায়ে হিজাজে অবস্থানের কারণে তিনি ‘ইমামুল হারামাইন’ নামে পরিচিত হন। পরে তিনি নিশাপুরে ফিরে এলে তাঁর দরসেই জ্ঞান অর্জন করেন আবু হামিদ আল-গাজালি। গাজালি জুওয়াইনির দরস থেকে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রায় এগিয়ে যান এবং পরবর্তী সময়ে ফিকহ, উসুল, কালাম, দর্শন ও আত্মশুদ্ধির প্রশ্নকে এক বিস্তৃত চিন্তাকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন।
নিশাপুরের এই জ্ঞানচর্চা কেবল ব্যক্তিগত আর মজলিশেই সীমাবদ্ধ ছিল না। উজির নিজামুল মুলকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নিশাপুরের নিজামিয়া মাদ্রাসায় ইমাম জুওয়াইনি শিক্ষকতা করেন। এর মাধ্যমে জ্ঞানচর্চা একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করে। শিক্ষক, ছাত্র, নির্দিষ্ট দরস ও আবাসনের ব্যবস্থা মিলিয়ে একটি ধারাবাহিক শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল। একসময় যে শহরে হাজারো শায়খের মজলিশ বসত, সেই শহর যুদ্ধের আগুনে বিপর্যস্ত ও ধ্বংস হয়েছিল এবং মানুষ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু নিশাপুরের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষিত ছিল মানুষের স্মৃতিতে ও লিখে যাওয়া গ্রন্থে। নিশাপুরের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সভ্যতার শক্তি শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতায় থাকে না, বরং তা থাকে মানুষের মনকে জাগিয়ে তোলার ক্ষমতার মধ্যে।