নেপাল ও চীনের হিমালয় সীমান্ত এলাকায় আঘাত হানা ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৮ আগস্ট) পর্যন্ত এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুই দেশে প্রাণহানি বেড়ে ৫৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ২ হাজার ৪৮২ জন।
নেপাল পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় বাগমতী প্রদেশে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫৭৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। অন্যদিকে, চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের শিগাৎসে প্রদেশের গিরং জেলায় ভূমিধসের ঘটনায় আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে দুই দেশে নিশ্চিত হওয়া নিহতের সংখ্যা ৩৬২ থেকে বেড়ে ৫৮৪ জনে পৌঁছাল। বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালানোর সময় একের পর এক লাশ উদ্ধারের কারণে মৃতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
বর্তমানে কেবল নেপালেই নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯২৪ জনে। আর তিব্বতে নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জন। দুই দেশ মিলিয়ে মোট নিখোঁজ ২ হাজার ৪৮২ জনের মধ্যে প্রায় ৩০টি দেশের ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া, নেপালে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণকাজে নিয়োজিত দক্ষিণ কোরিয়ার ৯ জন নাগরিকেরও এখন পর্যন্ত কোনো সন্ধান মেলেনি।
দুর্যোগপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান ও শ্রীলঙ্কা নেপালে উদ্ধারকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে নেপাল সরকার আপাতত কোনো বিদেশি উদ্ধারকারী দলের সহায়তা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী জানিয়েছেন, দেশটির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীই বর্তমানে উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। পরবর্তীতে বিশেষায়িত দক্ষতা বা সহায়তার প্রয়োজন হলে বিদেশি সহযোগিতা চাওয়া হবে।
এদিকে, নেপালের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মাণস্থলে এখনও শতাধিক মানুষ আটকে আছেন। বন্যার কারণে পুরো এলাকা কাদার পুরু স্তরে ঢেকে যাওয়ায় সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে বের করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। সেখানে আটকে পড়াদের উদ্ধারে নেপালের সেনাবাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও সুড়ঙ্গ থেকে প্রায় ৩৫০ জন শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। ভেতরে আটকে থাকা বাকি প্রায় ১০০ জনকে উদ্ধারে জোর চেষ্টা চলছে।
নেপালের উদ্ধারকারী কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত উপদ্বুত এলাকায় ১৪ হাজার ৮০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তারা এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৭৪২ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন। পাশাপাশি হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আরও ৩ হাজার ২৫৩ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে উদ্ধারকাজের মধ্যেই নতুন বিপদের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় ধ্বংসস্তূপ জমে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক বাঁধ উপচে পানি বাইরে চলে এসেছে। ফলে দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কায় নেপাল ও চীনের কিছু অংশে সাময়িকভাবে উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বিশাল হিমবাহ ও পাথরের স্তর ধসে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে আনুমানিক ৬০০ মিটার চওড়া একটি হিমবাহ ও পাথরের বিশাল খণ্ড ভেঙে পড়ার কারণে এই দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা এভাবে বাড়তে থাকলে হিমালয় অঞ্চলে ভবিষ্যতে এই ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।