সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান ও সাবেক রাষ্ট্রদূত প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল এই মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এই তিন দেশের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক হওয়ায় জোটটি ভবিষ্যতে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
আরব নিউজে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে প্রিন্স তুর্কি উল্লেখ করেন, এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক। এটি নির্দিষ্ট কোনো দেশকে লক্ষ্য করে গড়ে তোলা হয়নি। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এ ধরনের প্রতিরক্ষা জোট গঠন একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রচলিত বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, সম্ভাব্য কৌশলগত শূন্যতা, শক্তির ভারসাম্যের পরিবর্তন এবং পুরোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে এই তিন দেশের সহযোগিতা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রিন্স তুর্কি মনে করেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সক্ষমতা একত্রিত হলে তা নিজেদের এবং সমগ্র অঞ্চলের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যতে একই মনোভাবাপন্ন অন্যান্য দেশও এই জোটে যুক্ত হতে পারে। এই জোটের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একটি নতুন কৌশলগত সংযোগ তৈরি হবে। তবে এই জোটের চূড়ান্ত কার্যকারিতা নির্ভর করবে তিন দেশের সামরিক সমন্বয়, পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা এবং ভবিষ্যতে নতুন অংশীদার যুক্ত করার সক্ষমতার ওপর।
বিশ্লেষণে সৌদি আরবের বহুমুখী কৌশলগত গুরুত্বের বিষয়টিও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান, বিপুল তেলসম্পদ, আর্থিক সক্ষমতা, সামরিক শক্তি এবং কূটনৈতিক প্রভাবের কারণে রিয়াদ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম চালিকাশক্তি। বিশেষ করে লোহিত সাগরের অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে সৌদি বন্দর ও অবকাঠামোর গুরুত্ব সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হিসেবে রিয়াদের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহে বড় প্রভাব ফেলে। তবে প্রিন্স তুর্কির মতে, শুধু তেল রপ্তানিকারক হিসেবে দেখলে সৌদি আরবের প্রকৃত কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে না। ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় দেশটি এখন বিনিয়োগ, পর্যটন, লজিস্টিকস, উৎপাদন, খনিজ, নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, যা তাদের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব আরও বাড়াচ্ছে।
এছাড়া, মক্কা ও মদিনার মতো ইসলামের দুই পবিত্র নগরীর অবস্থান সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক ও ধর্মীয় প্রভাবের প্রধান ভিত্তি। প্রতি বছর লাখ লাখ মুসলমানের হজ ও ওমরাহ পালনের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে রিয়াদের এক নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। একই সাথে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি সৌদি আরব বর্তমানে চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথেও সম্পর্ক সম্প্রসারণ করছে। বহুমেরুকেন্দিক হয়ে ওঠা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সৌদি আরবের কূটনৈতিক গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১১: ২৭আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১১: ২৯