বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ২০১৫ সালে অপহরণ ও গুম করার ঘটনার তদন্ত শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম। তাকে বাংলাদেশ থেকে কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর। ইতিমধ্যে ভারত থেকে সে দেশের আদালতে চলা মামলার নথিপত্র এবং সাক্ষীদের জবানবন্দির অনুলিপিও সংগ্রহ করেছে প্রসিকিউশন বিভাগ।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে তৎকালীন বিএনপির মুখপাত্র সালাহউদ্দিন আহমদকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে সে সময় তার স্ত্রী হাসিনা আহমদ অভিযোগ করেছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, অপহরণের পর তাকে বাংলাদেশে প্রায় ৬১ দিন 'আয়নাঘর' হিসেবে পরিচিত প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের টিএফআই সেলে আটকে রাখা হয়েছিল। এরপর তাকে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংয়ে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
উদ্ধারের সময়ের বিবরণ দিয়ে প্রসিকিউটর বলেন, শিলংয়ে ট্রমাটাইজড বা চরমভাবে আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় ঘোরাঘুরির সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক সালাহউদ্দিন আহমদকে দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। পাসপোর্ট বা কোনো বৈধ ভ্রমণ নথি না থাকায় মেঘালয় পুলিশ তার বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারায় অনুপ্রবেশের মামলা দায়ের করে।
ভারতীয় আদালতে চলা সেই মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় উভয় পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সেখানে ভারতীয় পুলিশের সাক্ষীরাও আদালতে স্বীকার করেন যে, সালাহউদ্দিন আহমদকে বাংলাদেশ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ করে ভারতে এনে ছেড়ে দিয়েছিল। এই সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ২০১৮ সালে ভারতের নিম্ন আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেন। পরবর্তীতে ভারত সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলেও ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালত নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে তাকে খালাস দেন এবং দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এরপর ২০২৩ সালের ৮ মে সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে ফেরার জন্য আসাম রাজ্য সরকারের কাছে ভ্রমণ অনুমোদনের আবেদন করেছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, ৬ আগস্ট তিনি ট্রাভেল পাস বা ভ্রমণ অনুমোদন পান এবং একই বছরের ১১ আগস্ট দেশে ফিরে আসেন।
এর আগে, ২০২৫ সালের ৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে নিজের গুমের ঘটনার বিচার চেয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। ওই অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়। শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য অভিযুক্তরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহিদুল হক, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, এসবির সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান। এই মামলায় জিয়াউল আহসানকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান, দীর্ঘদিন গুম থাকার পর যারা ফিরে এসেছেন, তাদের প্রত্যেকের ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। সালাহউদ্দিন আহমদের মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় মূল তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। এই মামলার অনেক আসামি বর্তমানে কারাগারে আছেন এবং বাকিদের বিষয়ে তদন্ত শেষে গ্রেপ্তারের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।