বাংলাদেশে প্রতি বাজেটেই বড় রাজস্ব লক্ষ্য ধরা হয়, আর বছর শেষে সেই একই গল্প—লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এর পেছনে কর ফাঁকি, দুর্বল প্রশাসন, দুর্নীতি, বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, প্রযুক্তির কম ব্যবহার ও কর দেওয়ার অনীহার মতো পরিচিত কারণগুলো রয়েছে। এসব কারণ সত্যি হলেও প্রশ্ন থেকে যায়, এত সংস্কার, নতুন আইন, উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা আর ডিজিটাল ব্যবস্থার পরও সমস্যাগুলো কেন টিকে আছে? এনবিআর নিজেও জানে সমস্যা কোথায় এবং তাদের পরিকল্পনাতেই আধুনিক কর প্রশাসনের রূপরেখা আছে, তবু সংস্কার আটকে যায়।

২৩ আগস্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে এনবিআরের উপস্থাপনায় একটি চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, করছাড়ের পরিমাণ জিডিপির ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ, আর মোট কর আদায় মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ আমরা যত কর আদায় করি, প্রায় তার সমপরিমাণ রাজস্ব ছাড় দিই। এনবিআর সমস্যাটি ধরতে পেরেছে এবং তারা কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বদলে তথ্য, নিয়ম ও ঝুঁকি যাচাইয়ের ভিত্তিতে কর প্রশাসন চালাতে চায়। তবে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস এখনো অনেকটা আলাদা জগৎ হিসেবে কাজ করে, একজন করদাতার পুরো ছবি এক জায়গায় নেই। এছাড়া করনীতি ও কর আদায় একই প্রতিষ্ঠানে থাকা এবং কর নির্ধারণ, অডিট ও প্রয়োগের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া বড় বাধা।

গত তিন দশকের কর সংস্কারের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে ভ্যাট চালুর পাশাপাশি শুল্ক কমানো ও বাণিজ্য উদারীকরণের মতো বড় অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হয়। আশির দশকে সরকারের রাজস্ব জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রায় ৯ দশমিক ৬ শতাংশে ওঠে। কিন্তু সেই গতি থাকেনি। এরপর অটোমেশন, বড় করদাতা ইউনিট, অডিট সংস্কার ও করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও করছাড়, দর-কষাকষি ও কর্মকর্তার নিজস্ব সিদ্ধান্তের সুযোগ রয়ে গেছে। ২০১২ সালের ভ্যাট আইনও একই পথে গেছে—বাস্তবায়ন পিছিয়েছে, দুর্বল হয়েছে, শেষে কার্যকর হয়েছে ২০১৯ সালে। বাংলাদেশ আধুনিক করব্যবস্থার নানা উপকরণ নিয়েছে, কিন্তু যেসব সংস্কার প্রতিষ্ঠিত সুবিধা ও ব্যক্তিনির্ভর ক্ষমতা কমায়, সেগুলো টেকানো কঠিন হয়েছে।

অন্য দেশগুলো এমন কী করেছে যা বাংলাদেশ পারেনি? চীনের ১৯৯৪ সালের সংস্কারে করনীতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের হাতে রেখে কর আদায়ের জন্য সরাসরি স্টেট কাউন্সিলের অধীন শক্তিশালী জাতীয় কর প্রশাসন গড়ে তোলা হয়। ভারতের জিএসটি কাউন্সিল কেন্দ্র ও রাজ্যের স্বার্থ মেলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, পাশাপাশি আধার ও করদাতার স্থায়ী পরিচয় নম্বর (পিএএন) যুক্ত করা হয়েছে। নেপালের কর-জিডিপি অনুপাত ২০২৩ সালে প্রায় ১৪ শতাংশ, যা তাদের নতুন ফেডারেল কাঠামো ও ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। তিন দেশের পথ আলাদা হলেও মিলটি গুরুত্বপূর্ণ: বেশি রাজস্ব কেবল করহার বাড়িয়ে আসেনি, বরং করের আওতা বাড়ানো, বিশেষ সুবিধা কমানো, তথ্য এক করা এবং ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তের সুযোগ কমানোও ভূমিকা রেখেছে।

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন শুধু কত কর তোলা হবে তা নয়, কীভাবে তোলা হবে। এনবিআরের প্রস্তাবিত ‘একীভূত এনবিআর কাঠামো’ আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসকে একই প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আনতে চায়, যা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু যথেষ্ট নয়। করহার, করের ভিত্তি ও ছাড় নির্ধারণের নীতিগত কাজকে কর আদায় থেকে আলাদা করতে হবে। একইভাবে কর নির্ধারণ, অডিট, প্রয়োগ, আপিল ও করদাতা সেবার মধ্যেও স্পষ্ট সীমারেখা দরকার। আস্থা শুধু কর কীভাবে নেওয়া হয় তার ওপর নির্ভর করে না, করের টাকা কীভাবে খরচ হয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই কর সংস্কার বেশি টেকসই হয় যখন তা বৃহত্তর রাজস্ব সমঝোতার অংশ হয়, যেখানে নাগরিক উন্নত জনসেবা পাবেন এবং দেখবেন তাঁদের অর্থ জনস্বার্থে ব্যয় হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকার করনীতি ও কর আদায় আলাদা করতে অধ্যাদেশ জারি করলে এনবিআরের ভেতর থেকে তীব্র প্রতিরোধ আসে। কর্মকর্তাদের কিছু আপত্তি যৌক্তিক ছিল, বিশেষ করে নতুন কাঠামোয় তাঁদের পেশাগত ভূমিকা নিয়ে। কিন্তু আন্দোলন দ্রুত কর্মবিরতি ও রাজস্ব কার্যক্রম বন্ধের দিকে গড়ায়। এ অভিজ্ঞতার শিক্ষা হলো, শুধু অধ্যাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার হয় না। যাঁদের ক্ষমতা কমবে, তাঁদের হাতেই যদি রাজস্ব ও বাণিজ্য সচল রাখার চাবি থাকে, তাঁরা কার্যত ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। চ্যালেঞ্জটা আরও কঠিন হচ্ছে এলডিসি থেকে উত্তরণের কারণে। আমদানি শুল্কের ওপর নির্ভরতা কমলে সেই ঘাটতি দেশের ভেতরের কর থেকে তুলতে হবে। তাই প্রথম কাজ করছাড় বাতিল নয়, নিয়মের মধ্যে আনা। প্রতিটি ছাড়ের মেয়াদ ও প্রকাশ্য যুক্তি থাকা উচিত; নতুন করে অনুমোদন না পেলে তা শেষ হবে। পরিবর্তনের চাপ শেষ পর্যন্ত অর্থের প্রয়োজন থেকেই আসতে পারে। প্রশ্ন হলো, পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক খরচ কি এখন তা বদলানোর খরচকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে?