প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরে আজ ১ সেপ্টেম্বর নিজেদের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে ক্ষমতায় ফেরার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততায় দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারক ও মাঠপর্যায়ের নেতারা। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন এবং শীর্ষ নেতাদের বড় অংশই এখন মন্ত্রিসভা ও সংসদে ব্যস্ত। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি সংগঠনকে কতটা সক্রিয় ও জনসম্পৃক্ত রাখা যাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিএনপির মাঠপর্যায়ের রাজনীতির ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ দুই দশক ধরে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকা নেতা-কর্মীদের বড় অংশ এখন দলীয় পদ, সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় সমর্থনের দিকে ঝুঁকছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ঘিরে নতুন বলয় তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বিগত আন্দোলনের সময় মাঠে না থাকা নিষ্ক্রিয় ও সুবিধাবাদী ব্যক্তিদের প্রশাসনে জায়গা পাওয়া নিয়ে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে দলের একটি অংশের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও ‘মব’ সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠায় গত ২৭ আগস্ট সংসদীয় দলের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, সংশোধন না হলে আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
ক্ষমতার প্রথম ছয় মাসেই সরকারকে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও জনমনে অস্বস্তি রয়েছে। এসব ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো বিরোধী দলগুলো সরব ভূমিকা রাখছে। তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মনে করেন, এই সংকটের পেছনে সরকারের কোনো দায় নেই। তিনি বলেন, মূলত বৈশ্বিক কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির প্রভাবেই দেশে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে এবং সরকার দিনরাত এর সমাধানে কাজ করে যাচ্ছে।
সরকার ও দলের কাজে সমন্বয় আনতে সম্প্রতি কিছু সাংগঠনিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মহাসচিব পদ ছাড়লে রুহুল কবির রিজভীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। এছাড়া দলের স্থায়ী কমিটিতে চারজন নতুন সদস্য যুক্ত করা হয়েছে। দলটিকে তৃণমূল পর্যায়ে সচল করতে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলের জন্য বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে একই পদে একাধিক প্রার্থীর তৎপরতা কোন্দল বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভাগীয় নেতাদের নিয়ে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন এবং সংসদ সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় নেতৃত্বের দূরত্ব না বাড়ানোর নির্দেশ দিচ্ছেন।
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা বটমূলের উন্মুক্ত চত্বরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ক্ষমতায় ফেরা দলটির দায়িত্ব এখন অনেক বেশি বলে মনে করেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, প্রশাসন ও নিষ্ক্রিয় পুলিশের কারণে রাষ্ট্র পরিচালনা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। আমলাতন্ত্র থেকেও কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপিকে জনগণের কাছে যেতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে, এই সংকটের বড় অংশই তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। মানুষ বিষয়টি বুঝতে পারলে তা মেনে নেবে।