প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ০১ (2026)
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রচলিত বড় বাজারের বাইরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির অন্যতম আশার জায়গা ছিল অপ্রচলিত বা নতুন বাজারগুলো। তবে সম্প্রতি এই সম্ভাবনাময় বাজারটিতেও রপ্তানি কমার নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যা এ খাতের উদ্যোক্তাদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। একদিকে রপ্তানি কমে যাওয়া, অন্যদিকে জ্বালানি সংকটসহ নানামুখী অভ্যন্তরীণ সমস্যায় আগামী দিনগুলোতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদন এবং রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মেলা পুনরায় চালু ও সফরের মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়ন করা গেলে নতুন বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে ৬১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৬ শতাংশ। এই অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে জাপানে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি হয়। এ ছাড়া অন্যান্য প্রধান গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ভারত, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ব্রাজিল। সর্বশেষ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ছিল ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার, যা মোট আয়ের প্রায় ৮১ শতাংশ। বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানির প্রায় অর্ধেক যায় ইউরোপে। অন্যদিকে একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে মোট রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ পাঠানো হয়। সেই তুলনায় অপ্রচলিত বাজারগুলোর সম্মিলিত রপ্তানি প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের কাছাকাছি।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানি হয়েছিল ৬১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা তার আগের বছরের ৬৪৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের তুলনায় ৪.২৫ শতাংশ কম। এই সময়ে চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ব্রাজিল ছাড়া বাকি প্রায় সব দেশেই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে রাশিয়ায় রপ্তানি সবচেয়ে বেশি প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, আর ব্রাজিলে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইতেও এই নেতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। এ মাসে অপ্রচলিত বাজারে সম্মিলিত রপ্তানি হয়েছে ৫৮ কোটি ২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পোশাক, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে দশমিক ৪৮ শতাংশ কম। জুলাই মাসে মোট পোশাক রপ্তানিতে এই বাজারগুলোর অংশ ছিল ১৪.৯৩ শতাংশ। এই সময়ে জাপানে রপ্তানি দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ১০ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে, তবে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে রপ্তানি কমেছে যথাক্রমে দশমিক ৩৩ শতাংশ ও ৩.৯৭ শতাংশ।
উদ্যোক্তাদের মতে, এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি মূলত পোশাক খাতের সার্বিক মন্দারই অংশ। গত অর্থবছরের একটি বড় সময়জুড়ে পণ্য শিপমেন্টের জটিলতা এই পতনে ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে, রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যাংকিং ও লেনদেন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় তৈরি পোশাকের মূল্য পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে অনেক ব্যবসায়ীর কোটি কোটি টাকার রপ্তানি আয় আটকে গেছে এবং সরাসরি নতুন ক্রয়াদেশও কমে গেছে। পাশাপাশি গত ছয় মাস ধরে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রপ্তানিতে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু আমার দেশকে বলেন, অপ্রচলিত বাজারের এই নেতিবাচক প্রবণতা মূলত পুরো শিল্পের ওপর পড়া সামগ্রিক সংকটেরই অংশ, তবে এখানে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মাত্রা তুলনামূলক বেশি। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরবের বাজারে প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বাজারে পেমেন্ট সমস্যা, দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেখানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আউটলেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো রপ্তানি হ্রাসের পেছনে কাজ করেছে।
ব্যবসায়ীদের সূত্র জানায়, অনেক উদ্যোক্তা মূলত সরকারি প্রণোদনাকে লক্ষ্য রেখেই অপ্রচলিত বাজারে যুক্ত হয়েছিলেন, যার ফলে প্রচলিত বাজারের মতো ক্রেতাদের সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তদুপরি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে ইপিবির মাধ্যমে আয়োজিত দ্বিপক্ষীয় মেলাগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় বাজার সম্প্রসারণের সরকারি উদ্যোগ থমকে যায়। পাশাপাশি প্রতিযোগী দেশগুলোর উন্নত প্রযুক্তি ও সক্ষমতার কারণে বাংলাদেশ এই বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও গালপেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল আলম মীরু আমার দেশকে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিযোগী দেশগুলো অবকাঠামো, জ্বালানি ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের দিক থেকে আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। আমরা মূলত ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতার কারণে টিকে আছি। গত চার-পাঁচ বছর ধরে আমাদের সব সূচক নিম্নমুখী। আমাদের স্থায়িত্ব, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি মিলিয়ে বিশ্ব দরবারে দেশের ভাবমূর্তি খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, গত বছর প্রচলিত বাজারগুলোতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির প্রভাব নতুন বাজারেও পড়েছে। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে শুধু অপ্রচলিত বাজারই নয়, পুরো পোশাক খাতই হুমকির মুখে পড়বে। তবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু বাজারের বিষয়ে তারা আশাবাদী। রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা বাড়াতে বারবার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার তাগিদ দিয়েছেন তারা। তিনি আরও জানান, ইতোমধ্যে জাপান ও রাশিয়ায় দ্বিপক্ষীয় সফর ও মেলার আয়োজন করা হয়েছে এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও অনুরূপ কর্মসূচি নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সঠিক পদক্ষেপ নিলে অপ্রচলিত বাজারগুলো বাংলাদেশের পোশাক খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।