গত মঙ্গলবার রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৬৫০ জন ব্যক্তি। এই তালিকায় অন্যতম নাম সাবেক বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমান। তাঁর এই যোগদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জামায়াতের একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতা। অনুষ্ঠানে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানসহ দলের অন্যান্য শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সৈয়দ শাহিদুর রহমানের জামায়াতে যোগদান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহকারী (রাজনৈতিক) রাশেদ খাঁন বুধবার ফেসবুকে এক পোস্টে বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গ করে লেখেন, শাহিদুর রহমান জামায়াতে যোগ দিয়ে অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি আরও কটাক্ষ করে লেখেন, জামায়াত যেন এখন ‘অপরাধী পাপ মুক্তকরণ টিকিট’ দিচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের বক্তব্য জানার জন্য দলের কয়েকজন নেতা ও মিডিয়া সেলের দায়িত্বশীলদের ফোন করা হয়েছে এবং খুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে, তবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিচারপতি সৈয়দ শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিতর্ক নতুন নয়। ঘটনার সূত্রপাত ২০০৩ সালের ১ অক্টোবর। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ অভিযোগ করেছিলেন যে, হাইকোর্টের একজন অতিরিক্ত বিচারক তাঁর সহকর্মীর মাধ্যমে জামিন করিয়ে দেওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এরপর প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান তদন্তের জন্য বিষয়টি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠান। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ বিষয়টি তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে পাঠান।
২০০৪ সালের ২৬ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানের নেতৃত্বে গঠিত জুডিশিয়াল কাউন্সিলের তদন্ত প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়া হয়। ২৭ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি তদন্ত প্রতিবেদন আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠান। এরপর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতিকে অভিযুক্ত শাহিদুর রহমানকে অপসারণের পরামর্শ দেন। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের ৬ দফার ক্ষমতাবলে ২০০৪ সালের ২০ এপ্রিল এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সৈয়দ শাহিদুর রহমানকে হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক পদ থেকে অপসারণ করেন। সে সময় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি এম রুহুল আমিন ও বিচারপতি ফজলুল করিম।
২০০৪ সালে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে শাহিদুর রহমানকে নিয়োগ দিয়েছিল। তৎকালীন আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ (প্রয়াত) বলেছিলেন, এ ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। অপসারণের পরদিন ২১ এপ্রিল সৈয়দ শাহিদুর রহমান তাঁর বাসভবনে সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, তিনি কোনো অপরাধ করেননি এবং কুৎসিত রাজনীতির বলি হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অপসারণের আদেশের বিরুদ্ধে রিট করলে হাইকোর্ট ২০০৫ সালে তা অবৈধ ঘোষণা করেন। তবে ওই আদেশের বিরুদ্ধে আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান আপিল করলে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপতির অপসারণের আদেশই বহাল রাখেন, যার ফলে তাঁর বিচারক পদে ফেরার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।