চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার পাহাড়ি জনপদ জঙ্গল সলিমপুর। গত মার্চ মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এলাকাটি ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’ নেওয়ার দাবি করা হলেও, বাস্তবে এখনো কাটেনি স্থানীয় বাসিন্দাদের আতঙ্ক। সরকারি বিভিন্ন ক্যাম্প ও তল্লাশিচৌকি থাকা সত্ত্বেও বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের মতো মৌলিক সেবাগুলো এখনো রয়ে গেছে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে, স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের কবজায়।
জঙ্গল সলিমপুরের এম এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের পাশে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে দোকান চালানো শাহ আলমের মতো বাসিন্দারা এখনো ‘ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠনের রসিদে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেন। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে তাঁরা কখনোই সরাসরি কোনো বিল পান না। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরে তাদের বৈধ মূল সংযোগ রয়েছে মাত্র ২২টি। কিন্তু এই সংযোগগুলো থেকে অসংখ্য অবৈধ সাবলাইন ছড়িয়ে বসতিতে বিদ্যুৎ দেওয়া হয়েছে। কার কাছে এই বিদ্যুৎ বিলের টাকা যাচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব পিডিবির কাছে নেই। ২২টি মূল সংযোগের মধ্যে ৪টি রয়েছে স্থানীয় নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত মো. ইয়াসিনের নামে, বাকিগুলো অন্যান্য প্রভাবশালী ও সমিতির নামে রয়েছে।
পিডিবির ষোলশহর বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ছানা উল্লাহ জানান, প্রায় ২০ বছর আগে দেওয়া এই সংযোগগুলোর বিপরীতে বকেয়া দাঁড়িয়েছিল ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলেও এখনো ২৮ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়া পরিশোধের সময়সীমা প্রথমে ২০ আগস্ট এবং পরবর্তীতে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। পিডিবির কর্মীরা এখন বৈধ-অবৈধ সংযোগ যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছেন। তবে সব সংযোগ একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন করলে পুলিশ ক্যাম্প, পানির পাম্প ও সরকারি কার্যক্রম বিঘ্নিত হবে বলে ধীরে ধীরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুতের মতো পানির ব্যবস্থাও সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিভিন্ন গভীর নলকূপ ও পাম্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হলেও এর কোনো সমন্বিত হিসাব জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের কাছে নেই। গত ২৬ জুলাই আলীনগরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পের পানির লাইনে বিষাক্ত দ্রব্য মেশানোর ঘটনা ঘটে। সকালে পানির ট্যাংকে সাদা ফেনা দেখে সন্দেহ হওয়ায় পানি পান করে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিন পুলিশ সদস্য। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, পাইপ কেটে ভেতরে বিষাক্ত বা কীটনাশকজাতীয় পদার্থ ঢোকানো হয়েছিল। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।
গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির ৩ হাজার ১৭৩ সদস্যের এক বিশাল যৌথ অভিযানের পর চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন ঘোষণা করেছিলেন, জঙ্গল সলিমপুর পুরোপুরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ওই অভিযানে ২২ জন গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। কিন্তু এর আড়াই মাসের মাথায়, ২৪ মে দিবাগত রাতে আলীনগরের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এবং বুলডোজার দিয়ে দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয়। এমনকি যাতায়াত বন্ধ করতে চার জায়গায় রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছিল।
জঙ্গল সলিমপুরে অন্তত ৩০টি পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করা হয়েছে। আলীনগরে আড়াই কাঠার একেকটি প্লট ৩০ লাখ এবং ছোট প্লট ৫ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ২৬ হাজার ছোট প্লটের মধ্যে প্রায় ২৩ হাজারই বিক্রি হয়ে গেছে কোনো বৈধ দলিল ছাড়াই। এই অবৈধ প্লটগ্রহীতারা পরবর্তীতে স্থানীয় চক্রের বিদ্যুৎ ও পানির গ্রাহক হতে বাধ্য হন। এদিকে ২০২২ সালের সরকারি হিসাবে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমির কথা বলা হলেও বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, খাসজমি রয়েছে প্রায় এক হাজার একর। আগের হিসাবটি সলিমপুর ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজার সম্মিলিত আয়তন হতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা এখনো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের পাহাড়ে ২০ বছর ধরে বসবাসকারী রফিক উদ্দিন বলেন, এত পুলিশ-প্রশাসন থাকার পরও যদি ক্যাম্পে হামলা হয়, তাহলে ভয় তো থাকেই। বাসিন্দাদের আশঙ্কা, মূল নিয়ন্ত্রক মো. ইয়াসিন ও তাঁর সহযোগীরা গ্রেপ্তার না হলে তারা আবারও এলাকা দখল করবে। তবে চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী দাবি করেছেন, এলাকাটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ইয়াসিন ও রোকনসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, বাসিন্দাদের আতঙ্ক দূর করতে পুলিশ নিয়মিত তাঁদের সাথে কথা বলছে এবং ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।