প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৩৭আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ৩৯। উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের সভ্যতার ইতিহাস সুপ্রাচীন। পৌরাণিক যুগ থেকে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর শাসনাধীন এই অঞ্চলের রাজ্যগুলোর মধ্যে দীর্ঘতম সময় টিকে ছিল জৈন্তিয়া রাজ্য। আনুমানিক ৩১০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের কিছু আগে পূর্ব মেঘালয়ের পাহাড়ি অঞ্চল ও উত্তর সিলেটের সমতল ভূমি নিয়ে রাজ্যটির গোড়াপত্তন হয়। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত এটি কামরূপ অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত ‘নারী রাজ্য’ বা ‘জয়ন্তী রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত ছিল, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নারী সরদাররা শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন। ষষ্ঠ শতকের কোনো এক সময় সমতলের নিয়ন্ত্রণ কামরূপের এক নারী শাসকের হাতে চলে যায় এবং সপ্তম শতকে এই অংশ ভেঙে লাউড়, গৌড় ও জৈন্তিয়া নামে তিনটি পৃথক রাজ্যের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

সপ্তম থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত সমতলের জৈন্তিয়া রাজ্য দুটি ভিন্ন রাজবংশের অধীনে ছিল, তবে ১৫০০ সালের দিকে রাজ্যটি পুনরায় পাহাড়ি মাতৃপ্রধান জনগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে আসে। এই সময়ে সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে এবং নারী সরদারের পরিবর্তে ‘সিয়েম’ উপাধিধারী পুরুষ সরদারদের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। পাহাড় ও সমতলের এই ঐক্যবদ্ধ শক্তি পরবর্তী তিন শতক ধরে প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর আক্রমণের বিরুদ্ধে জৈন্তিয়াকে রক্ষা করে। অবশেষে ১৮৩৫ সালে রাজ্যটি ব্রিটিশদের হস্তগত হয়। বর্তমানে জৈন্তিয়া রাজ্যের সমতল ভূমি বাংলাদেশের সিলেট জেলার জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার অন্তর্ভুক্ত এবং মেঘালয়ের পূর্ব ও পশ্চিম জৈন্তিয়া পাহাড় জেলা দুটি রাজ্যের পার্বত্যাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। সমতল অঞ্চলে ১৮টি পরগনা—জয়ন্তাপুরী রাজ, জাফলং, চারিকাটা, ফালজুর, ধরগাম, চতুল, খরিল, পাঁচভাগ, আড়াইখা, চাউরা, মুলাগুল, সাতবাক, বাজেরাজ, পশ্চিমভাগ, বড়দেশ, বাউরভাগ, বর্ণফৌদ ও পিয়াইনগুল এবং পাহাড়ে ১২টি পার্বত্য পুঞ্জি বা এলাকা ছিল, যার মধ্যে Sutnga, Nartiang, Nongtalang or Natelang, Nangphyllut or Norpuh, Nongjngi, Nangbah, Lakadong, Shangpung, Mynso, Jowai, Raliang, Amwi or Rambhai উল্লেখযোগ্য।

পৌরাণিক গ্রন্থ যেমন জৈমিনি মহাভারত, কালিকাপুরাণ ও ভবিষ্যপুরাণে রাজ্যটিকে ‘জয়ন্তী’ বা ‘জয়ন্ত্যাং’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল ও গ্রন্থে একে ‘জয়ন্তীয়া’ বলা হয়েছে, যা ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি দলিলে ‘Jaintia’ হিসেবে ব্যবহারের ফলে ‘জৈন্তিয়া’ নামে পরিচিতি পায়। আধুনিক সময়ে এটি ‘জৈন্তা’ হিসেবেও উচ্চারিত হয়।

রাজ্যটির রাজধানী ছিল জয়ন্তীপুর, যা বর্তমানে জৈন্তাপুর উপজেলা সদরের নিজপাট মৌজায় অবস্থিত। দ্বাদশ শতকে (১১০১-১২০০ সাল) রচিত রাঘবপাণ্ডবীয় কাব্যগ্রন্থে রাজা কামদেবের রাজধানী হিসেবে এই শহরের উল্লেখ রয়েছে। সিন্টেং রাজাদের আমলের তাম্রফলক ও মুদ্রায় ‘জয়ন্তীপুর পুরন্দর’ বা ‘জয়ন্তাপুর পুরন্দরস্য’ অর্থাৎ জয়ন্তীপুরের শাসক বা রাজা উপাধিটি খোদাই করা পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে যে এই শব্দটি দ্বারা রাজ্য ও রাজধানী উভয়কেই নির্দেশ করা হতো।