দেশের চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে পতিত সরকারের ভুল জ্বালানি নীতি, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যর্থতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সঙ্গে বর্তমান সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই; বরং এটি অতীতের ভুল সিদ্ধান্ত ও নীতিরই প্রতিফলন। জনগণের কাছে এই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন, যাতে তারা জবাবদিহিতামূলক সরকারের কার্যকর ভূমিকা বিচার করতে পারেন।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ : আগামী দিনের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিতুমীর জানান, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও দাম নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে। বর্তমানে কাতার থেকে এলএনজি আমদানিতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১১ ডলার ব্যয় হচ্ছে, অথচ নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সক্ষমতা থাকলে এই খরচ অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।

অতীতের জ্বালানি নীতি নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেয়ে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছিল। পর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান না করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতার কারণেই আজকের এই সংকট। তিনি জ্বালানি খাতে ‘কস্ট অব ইনঅ্যাকশন’ বা সিদ্ধান্ত না নেওয়ার অর্থনৈতিক ব্যয়, ‘কস্ট অব রং ডুইং’ বা ভুল সিদ্ধান্তের ব্যয়, পাচার হওয়া অর্থ এবং জ্বালানি খাতের দায়-দেনার সমন্বিত হিসাব তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি অর্থনীতি সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয় ও থিংক ট্যাংকগুলোকে এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

অতীতের স্বজনতোষী পৃষ্ঠপোষকতা ও আমদানিনির্ভরতার ফলে জ্বালানি খাতে একটি অলিগার্কিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে বর্তমান সরকার এই সংকট মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে বলে তিনি জানান। বিশেষ করে চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের বিদ্যুৎ উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর ছাড়ের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ১৫০ শয্যার হাসপাতাল, কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং করোনারি কেয়ার ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তিনি জানান, বর্তমানে ৮ শতাংশের সামান্য বেশি থাকলেও তা ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। এছাড়া বন্ধ শিল্প কারখানা চালুর জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যার অর্থায়ন সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে গত অর্থবছরে রেকর্ড রাজস্ব আদায়ের তথ্য উল্লেখ করে তিনি গণমাধ্যমকে সরকারের কার্যক্রম যাচাই করার আহ্বান জানান। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সরকারের প্রথম প্রান্তিকের অগ্রগতি জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।