তীব্র গরম এবং দেশজুড়ে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির সংঘবদ্ধ চক্র সারা দেশে পল্লী বিদ্যুতের প্রায় কয়েক হাজার ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়েছে। রাতের আঁধারে বিদ্যুতের খুঁটি থেকে ভারী ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে চোরেরা ভেতরের মূল্যবান তামার তার ও যন্ত্রাংশ হাতিয়ে নিচ্ছে এবং ফাঁকা খোলসটি মাঠ বা রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যাচ্ছে। এই চুরির ঘটনার ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদে চরম বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে, যা জনজীবন ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
ট্রান্সফরমার চুরির এই ঘটনা উত্তর ও পূর্বাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। চাঁদপুর, জামালপুর, দিনাজপুর, নেত্রকোনা, ঠাকুরগাঁও ও মাগুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং শুরু হওয়ার পর থেকে ব্যাপক হারে এই চুরি শুরু হয়েছে। এর মধ্যে চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলায় পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। শুধু মতলব উত্তর উপজেলাতেই দেড় মাসে ২৩টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২-এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মো. নাঈম জানান, চোরেরা বিদ্যুৎ-সংক্রান্ত কাজে অভিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছে, কারণ বিদ্যুৎ লাইনে সংযোগ থাকা অবস্থায়ও তারা ট্রান্সফরমার খুলে নিতে সক্ষম হচ্ছে। জোনাল অফিসের ডিজিএম মো. ওয়াহিদুজ্জামান জানান, প্রতিটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে এবং গ্রাহকদের সচেতন করতে মাইকিং ও উঠান বৈঠক করা হচ্ছে।
দিনাজপুর জেলায় গত এক বছরে প্রায় চার শতাধিক ট্রান্সফরমার চুরির রেকর্ড রয়েছে। চোর চক্রটি সাধারণত আবাসিক এলাকার চেয়ে গভীর নলকূপ, স-মিল, রাইস মিল, পোলট্রি খামার কিংবা বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত ১০ থেকে ২৫ কেভিএ বা তার চেয়ে বড় ক্ষমতার ট্রান্সফরমারগুলোকে বেশি টার্গেট করছে। কারণ, এসব ট্রান্সফরমার থেকে অধিক পরিমাণে মূল্যবান তামার তার ও কয়েল পাওয়া যায়, যা অবৈধ ভাঙারিবাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হয়।
ভুক্তভোগী গ্রাহক ও কৃষকদের দাবি, বারবার ট্রান্সফরমার চুরির শিকার হওয়ায় তাদের সেচ কার্যক্রম ও ছোট শিল্পকারখানাগুলো পঙ্গু হয়ে পড়েছে। নতুন সংযোগ পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ ব্যয়ের কারণে তারা আর্থিকভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। স্থানীয়দের একাংশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, বিদ্যুৎ লাইন বা কারিগরি জ্ঞান ছাড়া খুঁটির ওপর থেকে এত ভারী যন্ত্র নামানো অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অসাধু কর্মচারী বা লাইনম্যানদের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। তবে পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, চোরেরা লোডশেডিংয়ের অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পেশাদার কৌশলে এই অপরাধ করছে।
পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, ট্রান্সফরমার চুরির পেছনে আন্তঃজেলা সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে এবং অবৈধ ভাঙারি দোকানগুলোর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের বিতরণ ও পরিচালন বিভাগের সদস্য মো. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে গ্রাহকদের সচেতন করার পাশাপাশি খুঁটির সাথে লোহার খাঁচা বা বিশেষ লকিং ব্যবস্থা ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।