দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এবার ডেঙ্গু ভাইরাসের ডেন-৩ ধরনটি প্রধান হয়ে উঠলেও ডেন-২ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ছড়াচ্ছে। একই সময়ে এই দুই ধরনের সেরোটাইপের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াচ্ছে এবং ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর ফার্মগেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরে জানা যায়, সরকারি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে রোগীরা বেসরকারি হাসপাতালে ছুটছেন। সেখানেও শয্যা সংকট তীব্র। বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক খালেদা আক্তার তাঁর ২২ বছর বয়সী ডেঙ্গু আক্রান্ত ছেলে ফাতেমিকে নিয়ে সরকারি দুটি হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে অবশেষে দৈনিক আট হাজার টাকা ভাড়ার কেবিন নেওয়ার কথা ভাবছিলেন। খালেদা আক্তার বলেন, "শেষ পর্যন্ত কেবিনটাই নিতে হবে। ছেলের জীবন আগে। তিন দিনে অনেক টাকা গেছে। আরও হয়তো যাবে। উপায় নেই।" শুধু ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরেও শয্যার জন্য হাহাকার চলছে। খুলনার টুটপাড়ার এক শিক্ষক গত মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি-বেসরকারি কোথাও শয্যা না পেয়ে অবশেষে বৃহস্পতিবার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে পেরেছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০,০৪৪ জন এবং মারা গেছেন ১১১ জন। অথচ গত বছরের একই সময় পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ৩৩,৩০৭ জন এবং মারা যান১৩০ জন। আর ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৪,৩২৫ এবং মৃত্যু হয়েছিল ৯৯ জনের। তবে সরকারি এই হিসাব কেবল হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের, মৃদু উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীরা এর বাইরে রয়েছেন। চলতি বছরের জুনে হাসপাতালে ভর্তি হন ২,৯০৭ জন, যা জুলাইয়ে তিন গুণের বেশি বেড়ে ৯,২০৬ জনে দাঁড়ায়। আগস্টে সংক্রমণ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২০,৫৩৬ জনে। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম চার দিনেও এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে।

অতীতে ২০০০ সাল থেকে দেশে ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। ২০১৯ সালে সংক্রমণ প্রথমবার এক লাখ ছাড়ায় এবং ২০২৩ সালে রেকর্ড ৩ লাখ ২১,১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন, মারা যান ১,৭০৫ জন। সাধারণত বড় প্রাদুর্ভাবের পর মানুষের শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ায় পরপরই একই মাত্রার ঢেউ দেখা যায় না। সে অনুযায়ী ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সংক্রমণ আগের রেকর্ড ছাড়ায়নি। কিন্তু চলতি বছরের জুলাই থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে।

ডেঙ্গুর সেরোটাইপ বিশ্লেষণ করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী জানান, গত জুনে বান্দরবান, বরগুনা ও পটুয়াখালীতে নমুনা জরিপে একটি মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। বরগুনা ও পটুয়াখালীর শহরাঞ্চলে ডেন-৩ এবং গ্রামাঞ্চলে ডেন-২ প্রধান ছিল। আবার বান্দরবানে ডেন-২-এর সংক্রমণ বেশি ছিল। সামগ্রিকভাবে এবার ডেন-৩ প্রধান হলেও ডেন-২-এর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ভিন্ন সেরোটাইপে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়ে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন জানান, দুই ধরনের সেরোটাইপের মিশ্রণ দ্রুত সংক্রমণের কারণ হতে পারে। এছাড়া নতুন কোনো সেরোটাইপ (যেমন ডেন-৪) যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিগত ৫ বছরে জন্ম নেওয়া শিশুরা যেকোনো টাইপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে এডিস মশার ঘনত্ব পরিমাপক ব্রুটো ইনডেক্স (বিআই) ঢাকার বাইরে উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার জানান, আগস্টের জরিপে বান্দরবানের মতো পাহাড়ি এলাকাতেও বিআই ৪০-এর বেশি পাওয়া গেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২১-২৫ আগস্টের জরিপেও মশার লার্ভার ঘনত্ব ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০.৩৩ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। কবিরুল বাশার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সেপ্টেম্বর মাসেই পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি নিয়ে ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, "গবেষণার কাজ আমরা করে দিয়েছি। মশার ধরন ও সেরোটাইপের কথাও জানিয়েছিলাম; কিন্তু সেসব মেনে কতটা কাজ হয়েছে জানি না।" অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ বলেন, "সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব আমাদের না। চিকিৎসার বিষয়ে বলতে পারি, সরকারি হাসপাতালে সব সময় রোগীর চেয়ে শয্যা কম থাকে। এটা নতুন কিছু নয়, চিকিৎসায় কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।"

বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে আক্রান্তের সংখ্যা ১০,০৪৮ জন হলেও বাকি রোগীরা ঢাকার বাইরের। ঢাকার বাইরে মশা নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ১০৯ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। ঢাকা বাদে চলতি বছর সবচেয়ে বেশি ৬,৩২৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন খুলনা বিভাগে, যেখানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গুর চিকিৎসায় সাধারণ মানুষ ব্যাপক আর্থিক সংকটে পড়ছেন, যেমন বেলায়েত হোসেনের জমানো টাকা শেষ হওয়ায় এখন ধারদেনা করে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।