বর্তমান সময়ে বাড়ি কিংবা দোকান ভাড়ার ক্ষেত্রে সিকিউরিটি মানি ও অ্যাডভান্স বা অগ্রিম লেনদেনের প্রচলন ব্যাপক। সাধারণত ভাড়াটিয়া চলে যাওয়ার সময় কোনো ক্ষতি করে গেলে তা পুষিয়ে নেওয়ার জন্য ভাড়াদাতারা এই অতিরিক্ত টাকা গ্রহণ করে থাকেন। তবে সঠিক শরিয়ি জ্ঞান না থাকার কারণে এই লেনদেনগুলোতে অনেক সময়ই নানারকম ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকে, যা এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সিকিউরিটি মানি ও অ্যাডভান্সের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। জামানত হিসেবে ভাড়া গ্রহীতার কাছ থেকে যে টাকা রাখা হয় এবং চুক্তি শেষে যা আবার ফেরত দিতে হয়, তাকে সিকিউরিটি মানি বলা হয়। এই টাকার মালিকানা মূলত ভাড়াটিয়ার কাছেই থাকে। যেহেতু ভাড়াটিয়া পরবর্তীতে এই টাকা ফেরত পাবেন, তাই এর জাকাতও ভাড়াটিয়াকেই প্রদান করতে হবে। অন্যদিকে, এককালীন টাকা গ্রহণ করে প্রতি মাসে তা থেকে কিছু কিছু করে ভাড়া হিসেবে কেটে নেওয়াকে অ্যাডভান্স বা অগ্রিম ভাড়া বলা হয়। এই টাকার মালিকানা ভাড়াটিয়া থেকে ভাড়াদাতার কাছে চলে যায়। তাই এ টাকা পরবর্তীতে ফেরত দিতে হয় না এবং এর জাকাত ভাড়াদাতার ওপর আবশ্যক হবে (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল : ১/১৪৭-১৪৮, মালে হারাম আওর উসকে মাসারেফ ওয়া আহকাম : ৮৫)। আর যদি টাকাটা শুধু জামানত বা ঋণ হিসেবে দোকান ও বাড়ির মালিকের কাছে গচ্ছিত রাখা হয়, তবে মূল মালিক যেহেতু ভাড়াটিয়া, তাই এর জাকাতও জমাদাতা ব্যক্তির ওপরই আসবে।
অনুরূপভাবে, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে অথবা ব্যাংকে গ্যারান্টি মানি হিসেবে যে সিকিউরিটি মানি জমা রাখা হয়, তার মালিকানাও প্রদানকারীর কাছেই থাকে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে এই অর্থ ফেরত পাওয়া যায় বিধায় এই টাকার জাকাতও প্রদানকারী ব্যক্তিকেই আদায় করতে হবে, গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংককে নয়।
আমাদের সমাজে সিকিউরিটি মানির পরিমাণ বেশি হলে মাসিক ভাড়া কমিয়ে দেওয়ার একটি সাধারণ প্রচলন রয়েছে, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। সিকিউরিটি মানি ভাড়াদাতার কাছে মূলত ঋণ হিসেবে থাকে। ঋণের কারণে ভাড়ার পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হলে তা ঋণ দিয়ে ঋণগ্রহীতা থেকে অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণের অন্তর্ভুক্ত; যা সুদ ও হারাম হিসেবে গণ্য হয় (আস সুনানুল কোবরা লিল বায়হাকি : ৫/৫৭৩, আল মাবসুত লিস সারাখসি : ১৪/৩৫)। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, 'যে ব্যক্তি কোনো বস্তু ঋণ দেবে, সে যেন অতিরিক্তি কিছু গ্রহণের শর্ত না করে; যদিও তা একমুঠো ঘাস হোক না কেন।' (মুয়াত্তায়ে মালেক : ২৫১৩)। তবে অ্যাডভান্স বা অগ্রিম ভাড়ার বিষয়টি ভিন্ন। যেহেতু এটি ঋণ নয় বরং অগ্রিম প্রদেয় ভাড়া, তাই অ্যাডভান্সের বিপরীতে ভাড়া কমানোর সুযোগ রয়েছে। যেমন— একটি ফ্ল্যাটের জন্য ৫০ হাজার টাকা সিকিউরিটি মানি প্রদান করলে ভাড়া হবে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। কিন্তু সিকিউরিটি হিসেবে ২ লাখ টাকা অগ্রিম দিলে ভাড়া কমিয়ে ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করা জায়েজ নয়। তবে এই টাকা অগ্রিম ভাড়া হিসেবে দিলে ভাড়া কমানো যাবে।
শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, জামানত বা সিকিউরিটি হিসেবে রাখা টাকা বন্ধক হিসেবে গণ্য হয়। বন্ধকী বস্তু ব্যবহার করা নাজায়েজ এবং সুদের অন্তর্ভুক্ত। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) সূত্রে বর্ণিত আছে, এক ব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাছে এসে বলল, 'আমার কাছে এক ব্যক্তি একটি ঘোড়া বন্ধক রেখেছে। আমি এতে আরোহণ করেছি। এর কী হুকুম?' তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বললেন, 'তুমি এর পিঠ থেকে (আরোহণ করে) যে উপকৃত হয়েছ, তা সুদের অন্তর্ভুক্ত।' (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক : ১৫০৭১)।
তবে এ ক্ষেত্রে বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে। সিকিউরিটির টাকা ভাড়াগ্রহীতা থেকে ঋণ হিসেবে নিলে তা ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু তখন এই সিকিউরিটি মানির কারণে ভাড়া কমানো যাবে না। ঋণের চুক্তিটি ভাড়া গ্রহণের সময় না করে পরে করতে হবে এবং ভাড়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক থাকতে পারবে না। কারণ একটি চুক্তির সঙ্গে অন্য চুক্তি শর্তযুক্ত করা শরিয়তে নিষিদ্ধ, যাকে 'সাফকাতাইনে ফি সাফকাহ' বা 'বাইআতাইনে ফি বাইআহ' বলা হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ ও বৈধ পদ্ধতি হলো, ভাড়াদাতা ভাড়াগ্রহীতা থেকে এককালীন টাকাটি অ্যাডভান্স বা অগ্রিম ভাড়া হিসেবে নেবেন, যা চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া হিসেবে কর্তিত হবে। এতে বাড়ি বা দোকানের মালিক একত্রে বেশি টাকাও নিতে পারবেন এবং তা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধও হবে (মুসনাদে আহমদ : ৬৬২৮, শরহুল মাজাল্লাহ, খালিদ আতাসি : ৩/১৪৫, ১৯৬)।