ইসলামে দান-খয়রাতের গুরুত্ব অপরিসীম। আপাতদৃষ্টিতে দান করলে নিজের সঞ্চিত অর্থ কমে যাচ্ছে মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর পথে দান করলে মানুষের রিজিক ও বরকত বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তবে দানের দুটি দিক রয়েছে—একটি কল্যাণ ও পুণ্যের পথ, অন্যটি অকল্যাণ ও পাপের পথ। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে করা দানই মানুষের জন্য প্রকৃত কল্যাণ ও পুণ্য বয়ে আনে। পক্ষান্তরে পাপের কাজে অর্থ ব্যয় বা দান করা হলে তা উপকারের বদলে সমাজে অনর্থ ও অপকার ডেকে আনে।

আল্লাহর পথে ব্যয় করার মাধ্যমে দাতার রিজিকে অভাবনীয় বরকত আসে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-খয়রাতকে বর্ধিত করেন।’ (সুরা বাকারা : ২৭৬)। কোনো মানুষকে ঋণ দেওয়া হলে তা ফেরত পেতে অনেক সময় টালবাহানা বা বিলম্ব সহ্য করতে হয়। কিন্তু আল্লাহকে উত্তম ঋণ (করজে হাসানা) দেওয়ার অর্থ হলো তাঁরই পথে ব্যয় করা, যার প্রতিদান তিনি ইহকাল ও পরকালে বহুগুণ বাড়িয়ে ফেরত দেন। এই প্রসঙ্গে সুরা বাকারার ২৪৫ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘এমন কে আছে, যে আল্লাহকে করজ দেবে, উত্তম করজ। অতঃপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ-বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন। আল্লাহই সংকোচিত করেন এবং তিনিই প্রশস্ততা দান করেন। আর তাঁরই কাছে তোমরা ফিরে যাবে।’

মানুষের নানা অন্যায় ও পাপের কারণে মহান আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন। এই ঐশ্বরিক অসন্তুষ্টি, আকস্মিক দুর্ঘটনা এবং মন্দ মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো দান করা। দান-খয়রাতের মাধ্যমে যাবতীয় বালা-মসিবত দূর হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দান-খয়রাত আল্লাহতায়ালার অসন্তুষ্টি কমিয়ে দেয় এবং মন্দ মৃত্যু রোধ করে।’ (তিরমিজি : ৬৬৪)। একই সঙ্গে দান মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ভুল-ত্রুটি ও গোনাহ মোচনে সাহায্য করে। সুরা বাকারার ২৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-খয়রাত করো, তবে তা কতই না উত্তম। আর যদি গোপনে করো এবং অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। আল্লাহ তোমাদের কিছু গোনাহ দূর করে দেবেন। তিনি তোমাদের কাজকর্মের খবর রাখেন।’ এছাড়া সুনানে ইবনে মাজাহ-র ৪২১০ নম্বর হাদিসে রাসুল (সা.)-এর বাণী উল্লেখ রয়েছে, ‘ can ‘হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা নেক আমলগুলো খেয়ে ফেলে, যেমন আগুন জ্বালানি কাঠ খেয়ে ফেলে। দান-খয়রাত গোনাহগুলো বিলীন করে দেয়, যেমন পানি আগুন নেভায়।’

আল্লাহর পথে হালাল উপার্জনের সামান্যতম দানও পরকালে পাহাড়সম সওয়াবে পরিণত হতে পারে। কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী, এক টাকা দানের সওয়াব সাতশ গুণ বা তার চেয়েও বেশি বৃদ্ধি করা হয়। সুরা বাকারার ২৬১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো; যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশত করে দানা থাকে। আল্লাহ অতি দানশীল, সর্বজ্ঞ।’ সুনানে নাসাঈর ৩১৮৬ নম্বর হাদিসেও রাসুল (সা.) বলেছেন যে, আল্লাহর রাস্তায় কোনো কিছু দান করলে তার জন্য সাতশত গুণ সওয়াব লেখা হয়। বুখারি শরিফের ৭৪৩০ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে লোক তার হালাল ও পবিত্র উপার্জন থেকে একটি খেজুর পরিমাণও দান করে, আল্লাহ তা তাঁর ডান হাত দ্বারা কবুল করেন। আর পবিত্র ও হালাল বস্তু ছাড়া আল্লাহর কাছে কোনো কিছু পৌঁছে না। তারপর এটি তার মালিকের জন্য লালন-পালন ও পরিচর্যা করতে থাকে, তোমরা যেমন ঘোড়ার বাচ্চাকে লালন-পালন করতে থাকো। অবশেষে তা পর্বতের মতো বিরাট আকার ধারণ করে।’

পরকালের কঠিন সময়ে দানকারী ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার হবে আল্লাহর আরশের নিচে আশ্রয় লাভ। রাসুল (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না, তখন সাত শ্রেণির মানুষ সেই ছায়াতলে আশ্রয় পাবেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি এত গোপনে দান করেন যে তাঁর ডান হাত যা দান করে, বাম হাত তা টের পায় না (বোখারি : ১৪২৩)। এছাড়া সুনানে বায়হাকির ৩৩৪৭ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, ‘দান অবশ্যই কবরবাসীর কবরের উত্তাপ ঠান্ডা করে দেবে এবং মোমিন ব্যক্তি কেয়ামতে আল্লাহর ছায়ায় অবস্থান করবে।’