সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থা 'আইবাস প্লাস প্লাস' (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম) ব্যবহার করে সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের পেনশন হিসাবে অতিরিক্ত অর্থ পাঠিয়ে বড় ধরনের জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। প্রাথমিক তদন্তে ২৬ জন পেনশনভোগীর ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে ৩৪৬টি ভুয়া বকেয়া পেনশন বিল তৈরির মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে ৬ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার ৯২৮ টাকা আত্মসাতের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথমে ২০২৪ সালে ২৩ জন পেনশনভোগীর ব্যাংক হিসাবে ৪ কোটি ২৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেলেও পরে তদন্তে আরও বড় অঙ্কের জালিয়াতি উন্মোচিত হয়।

এই অভিনব জালিয়াতির কৌশলে প্রথমে অনুমোদনহীন বকেয়া বিল তৈরি করে পেনশনভোগীর ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হতো। এরপর সংশ্লিষ্ট পেনশনভোগীকে একটি নির্দিষ্ট কমিশন দিয়ে বাকি টাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ফেরত নেওয়া হতো। পরবর্তীতে জালিয়াতি ঢাকতে ভুয়া ট্রেজারি চালান দেখিয়ে নথিতে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হতো যে অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত এসেছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত ২ সেপ্টেম্বর কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্সের (সিজিডিএফ) অধীন চিফ কন্ট্রোলার অব ডিফেন্স ফাইন্যান্স (পেনশন অ্যান্ড ফান্ড) বা সিসিডিএফ কার্যালয়ের সাবেক অডিট সুপার শাহীনুর রহমান খান ও ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ফাইন্যান্স কন্ট্রোলার ইশরাত জাহানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তদন্তে উঠে এসেছে, বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আক্তার হোসেনের মাসিক পেনশন ১৫ হাজার৪০৬ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও গত জুনে তিনি নিয়মিত পেনশনের পাশাপাশি আরও প্রায় ৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত পান। সিসিডিএফ কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবে তিনি এই টাকা পান এবং চুক্তি অনুযায়ী ১ লাখ টাকা কমিশন রেখে বাকি টাকা চক্রের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে ফেরত দেন। এভাবে এক বছরের বেশি সময়ে পেনশনের বাইরে প্রায় ৭২ লাখ টাকা পেয়েছেন আক্তার হোসেন, যেখানে তাঁর পেনশন ও উৎসব ভাতা মিলিয়ে পাওয়ার কথা ছিল মাত্র দুই লাখ টাকার কিছু বেশি।

একইভাবে নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য জি এম সাজ্জাদ হোসেনের হিসাবে এক বছরের বেশি সময়ে ৩২টি লেনদেনে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া আট মাসে ২২টি লেনদেনে মো. হারুন অর রশিদ মৃধার হিসাবে প্রায় ৪৪ লাখ, ছয় মাসে ২০টি লেনদেনে মো. শাহিনুর ইসলামের হিসাবে প্রায় ৪০ লাখ, তিন মাসে আটটি লেনদেনে মো. শাহার আলীর হিসাবে প্রায় ১৬ লাখ, তিন মাসে ছয়টি লেনদেনে আমজাদ হোসেনের হিসাবে প্রায় ১২ লাখ এবং এক মাসে দুটি লেনদেনে খন্দকার আবুল হোসাইনের হিসাবে প্রায় চার লাখ টাকা পাঠানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী বকেয়া পেনশন বা অতিরিক্ত অর্থ পাঠাতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগে এবং এক অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩০টি লেনদেন করা যায়। কিন্তু কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রতিবার লেনদেনের সর্বোচ্চ সীমা বজায় রাখতে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৯৮০ টাকা করে পাঠানো হতো।

পেনশনভোগীদের কাছ থেকে নেওয়া অতিরিক্ত অর্থ আদনান এন্টারপ্রাইজ, তামান্না এন্টারপ্রাইজ ও আদর্শ স্টেশনারি নামের তিনটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে ফেরত নেওয়া হতো। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের খুলনা ও রাজশাহী শাখা থেকে আদর্শ স্টেশনারির হিসাবে ৯ লাখ ১০ হাজার টাকা জমা দেওয়া হয়েছে, যার মালিক জি এম সাজ্জাদ হোসেন এবং অর্থ জমা দেন এম শাহিন। এছাড়া আল-আরাফাহ্ ব্যাংকের খুলনা শাখা থেকে আদনান এন্টারপ্রাইজের হিসাবে ১০ লাখ টাকার বেশি এবং টাঙ্গাইল শাখা থেকে তামান্না এন্টারপ্রাইজের হিসাবে ৩ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে, যার জমাদানকারীও ছিলেন এম শাহিন। নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য আমজাদ হোসেন জানান, পূর্বপরিচিত এম শাহিন তাঁর বাবার বকেয়া মুক্তিযোদ্ধা ভাতা আসবে বলে আমজাদের ব্যাংক হিসাব নম্বর নিয়েছিলেন এবং তিন মাসে প্রায় ১২ লাখ টাকা লেনদেন করেন।

জালিয়াতি ঢাকতে ব্যবহৃত ভুয়া ট্রেজারি চালানের নথিতে দেখা গেছে, শাহিনুর ইসলামের নামে ২৫ মার্চের একটি চালানে ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪০ টাকা জমা দেখানোর কথা বলা হলেও অনলাইনে যাচাই করে দেখা যায় সেটি প্রকৃতপক্ষে ইকবাল হাসান রবিন নামের এক ব্যক্তির মাত্র ৮ হাজার ৫০ টাকার চালান ছিল। শাহিনুরের নামে ৮ জুলাইয়ের ৮ লাখ টাকার আরেকটি চালানে অর্চনা রানী দত্ত নামের এক নারীর মাত্র ৪৯৪ টাকার চালান ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া সাজ্জাদ হোসেনের নামে ১৬ লাখ টাকা জমা দেখানোর নথিতে শাহ আলম কবিরের ৩ হাজার ৬ টাকার চালান এবং আক্তার হোসেনের নামে ১২ লাখ টাকা ফেরত দেখাতে মিরাজ উদ্দিনের ১২ হাজার ১২২ টাকার চালান ব্যবহার করা হয়। হারুন অর রশিদ মৃধার নামে ১২ লাখ ও ১৬ লাখ টাকার দুটি ভুয়া চালানের একটিতে প্রকৃত জমা ছিল ১ হাজার টাকা এবং অন্যটিতে ছিল ১২ হাজার ১২২ টাকা।

মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নুরুল ইসলাম জানান, জালিয়াতির কথা জানার পর তিনি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত ১৭ আগস্ট তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যা পরে পুনর্গঠন করে এ কে এম হাছিবুর রহমানকে আহ্বায়ক, মো. মফিজুর রহমানকে সদস্যসচিব ও মোছা. বিউটি খাতুনকে সদস্য করা হয়। যদিও যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাতে কেবল গত দুই অর্থবছরের (2024-25 ও 2025-26 / ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬) এ–সংক্রান্ত লেনদেন যাচাই করতে বলা হয়েছে। কমিটি সিসিডিএফ কার্যালয়ের 2024-25 ও 2025-26 (২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬) অর্থবছরের পেনশন বিবরণী, পরিশোধিত বকেয়া বিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইবাস প্লাস প্লাসের ইউজার আইডিসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়েছে। তবে সদস্যসচিব মফিজুর রহমান ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত ওই কার্যালয়ে কর্মরত থাকায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে। সিসিডিএফ কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৩ সালের পর থেকে পেনশন কার্যক্রমের নিয়মিত নিরীক্ষা (অডিট) না হওয়ায় এই জালিয়াতি সহজে ধরা পড়েনি।

আইবাসের মাধ্যমে সরকারি অর্থ সরানোর আরেকটি জালিয়াতি বগুড়াতেও ধরা পড়েছে। সেখানে ছয় পুলিশ সদস্যের নামে ১৯৫টি ভ্রমণ ও শ্রান্তি-বিনোদন ভাতা বিলে ১ কোটি ২৪ লাখ ৬৪ হাজার ৮২৬ টাকা অনিয়মিতভাবে পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া ভুয়া পেনশন বিলের মাধ্যমে তিনটি ব্যাংক হিসাবে অন্তত ১ কোটি ২৪ লাখ ৩ হাজার টাকা স্থানান্তরের তথ্য পেয়েছে সিআইডি। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেহেতু নিজেদের তদন্তেই জালিয়াতির বিষয়টি উঠে এসেছে, তাই এটিকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এই ধরনের সব ঘটনার আপাদমস্তক তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।