সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যায় হাসপাতালের বিছানায় শয্যাশায়ী এক বৃদ্ধের কাছ থেকে তাঁর মেয়ে জোর করে জমির দলিলে সই নেওয়ার চেষ্টা করছেন। ৩ সেপ্টেম্বর ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিওটি দেখার পর সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জেগেছে, হাসপাতালের বিছানায় বসে সই করালেই কি আইনত জমির মালিকানা বদলে যায়? এমন পরিস্থিতিতে আইনি বৈধতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটিই বা কী?
জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কেবল দলিলে স্বাক্ষরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভূমি রেজিস্ট্রেশনের প্রক্রিয়া মূলত রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮ অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়। স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিয়ম অনুযায়ী, জমির পুরোটা বা বড় অংশ যে উপজেলায় অবস্থিত, সেই এলাকার সাবরেজিস্ট্রারের কার্যালয়েই দলিল উপস্থাপন করতে হয়। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩৪ ধারা অনুযায়ী, দলিল সম্পাদনকারীকে অবশ্যই নিবন্ধন কর্মকর্তার সামনে সশরীরে হাজির হতে হবে। নিবন্ধন কর্মকর্তা তখন অনুসন্ধান করবেন যে দলিলটি যাঁরা করেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে, তাঁরা সত্যিই সেটি সম্পাদন করেছেন কি না। একই সঙ্গে তাঁদের পরিচয়ও যাচাই করতে হবে। দাতা বা বিক্রেতা নিজের ইচ্ছায় দলিলটি সম্পাদন করছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দলিলে স্বাক্ষর করা আর দলিল নিবন্ধন করা এক বিষয় নয়। রেজিস্ট্রেশন আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী, স্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। আর ৪৯ ধারা অনুযায়ী, নিবন্ধনযোগ্য কোনো দলিল নিবন্ধিত না হলে তা দিয়ে নতুন মালিকের আইনগত অধিকার সৃষ্টি, ঘোষণা, হস্তান্তর, সীমিত বা বিলুপ্ত করা সম্ভব নয়। সাধারণত উইল ছাড়া নিবন্ধনযোগ্য দলিল সম্পাদনের তারিখ থেকে তিন মাসের মধ্যে নিবন্ধনের জন্য উপস্থাপন করতে হয়। তবে বাস্তবে অনেকেই সময় বাঁচানোর জন্য আগে থেকেই দলিলে স্বাক্ষর করে রাখেন।
জমি নিবন্ধনের প্রক্রিয়ায় দাতার স্বাক্ষরের পাশাপাশি তাঁর টিপসই বা আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যদি কোনো ব্যক্তি অসুস্থতার কারণে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে যেতে অক্ষম হন, তবে আইনি ব্যবস্থায় এর জন্য বিশেষ সুযোগ রয়েছে। রেজিস্ট্রেশন আইনের ৩৮ ধারা অনুযায়ী, শারীরিক অসুস্থতা বা অক্ষমতার কারণে অফিসে উপস্থিত হতে না পারা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ‘কমিশন’ প্রক্রিয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য হলো, যিনি শারীরিক কারণে অফিসে যেতে পারছেন না, তাঁর কাছে নিবন্ধন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত কর্মকর্তা গিয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাবরেজিস্ট্রার ও ভূমি রেজিস্ট্রেশন বিশেষজ্ঞ মো. শাহাজাহান আলীর ভাষ্যমতে, অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে ‘ভিজিট’ বা ‘কমিশন’ প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা হাসপাতালে যেতে পারেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে রেজিস্ট্রি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অর্থাৎ পরিবারের কেউ নিজের উদ্যোগে দলিল নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে সই করিয়ে আনলেই সেটি কমিশন প্রক্রিয়া হয়ে যায় না; বরং রেজিস্ট্রি অফিসের একজন কর্মকর্তা উপস্থিত থেকে পরিচয় যাচাই ও সম্পাদন নিশ্চিত করলেই কেবল তা বৈধতা পায়।
জমি রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি, স্ট্যাম্প শুল্ক, উৎসে কর এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ রয়েছে। সাধারণ বিক্রয় দলিলের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন ফি দলিল মূল্যের ১ শতাংশ এবং স্ট্যাম্প শুল্ক ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এর সঙ্গে স্থানীয় সরকার কর ও উৎসে কর যুক্ত হয়। ২০২৬ সালের সংশোধিত বিধানে জমির অবস্থান ও শ্রেণিভেদে উৎসে করের হারে ভিন্নতা রয়েছে। তবে মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে হেবা বা নির্দিষ্ট সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি সাধারণ বিক্রয় দলিলের তুলনায় কম হতে পারে। এর বাইরেও জমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় অনানুষ্ঠানিক খরচ বা উৎকোচ দিতে হয় বলেও অভিযোগ দীর্ঘদিনের।