বাংলাদেশে প্রতিদিন অবৈধ পথে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার সোনা প্রবেশ করছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই বিশাল পরিমাণের সোনার সিংহভাগই পরবর্তী সময়ে স্থলপথে প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সোনা চোরাচালান চক্রের কাছে বাংলাদেশ এখন একটি নিরাপদ ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। এই চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিমান ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরে শুধু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই প্রায় দুই হাজার কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ দশমিক ১ কেজি। জব্দ করা এই সোনার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। তবে দেশে প্রতিদিন যে পরিমাণ সোনা চোরাচালান হচ্ছে, তার তুলনায় এই উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমাণ খুবই সামান্য। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আকাশপথে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের মাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে অবৈধ সোনার চালান ঢুকছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নানা কৌশলে অভিযান চালিয়েও এই চোরাচালান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।

বাজুসের একটি সূত্র জানায়, আকাশপথে দেশে আসা সোনা পরে অন্তত আটটি সীমান্ত জেলার ৯০টি পয়েন্ট দিয়ে ভারতে পাচার হয়ে যায়। চোরাচালানের বাহকরা মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। মূলত সৌদি আরব, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমান, কাতার ও হংকং থেকে চোরাই পথে দেশে সোনা আসে, যার প্রধান প্রবেশপথ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সূত্র জানায়, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শতাধিক অভিযানে মোট ১ হাজার ৮৮০ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে বৈধভাবে দেশে আসা সোনা ও অলংকার থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে মাত্র ২৩৮ কোটি টাকা। ঢাকা কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে চালানের সংখ্যা কমলেও চালানের আকার দিন দিন বড় হয়েছে। চলতি বছরেও কয়েকটি বড় চালান জব্দ হয়েছে, যা চোরাচালান চক্রের সাহসিকতা এবং অভ্যন্তরীণ সহায়তার ইঙ্গিত দেয়।

চোরাচালানিদের ব্যবহৃত নানা কৌশলের প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক কয়েকটি বড় চালানের ঘটনায়। গত ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট প্যানেলের ভেতর থেকে ১৫৩টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম ওজনের এই চালানের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা হলেও শুধু বাহকদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে, মূল চক্রের পরিচয় এখনো মেলেনি। তদন্তকারীদের মতে, টয়লেট প্যানেলের মতো সংবেদনশীল স্থানে সোনা লুকাতে অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা প্রয়োজন হয়ে থাকে। একইভাবে গত ২ জুলাই আরেকটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম ওজনের ১৬০টি সোনার বার জব্দ করা হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। দুবাই থেকে সরাসরি আসা এই চালানটি বিমানবন্দরের ভেতরেই হস্তান্তরের পরিকল্পনা ছিল। এই মামলাতেও শুধু বাহক পর্যায়ের কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে, মূল অর্থ জোগানদাতারা অধরাই রয়ে গেছে।

অন্য একটি ঘটনায় গত ১৯ জুলাই ক্যাথে প্যাসিফিকের একটি কার্গো ফ্লাইটে হংকং হয়ে আসা রাম্বুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডোভর্তি কাঠের ক্রেট থেকে ১৬ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়। ৩৫ কোটি টাকা মূল্যের এই চালানটি স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর নামে বুক করা হয়েছিল এবং ফলের ক্রেটকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সাধারণ স্ক্যানিংয়ে সহজে ধরা না পড়ায় এই পদ্ধতি চোরাচালানিদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এছাড়া গত ১০ আগস্ট বিমানবন্দরের বাইরে একটি গাড়ি থেকে ৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা মূল্যের ১ দশমিক ৮১২ কেজি সোনার বার ও শিট উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় গাড়িচালক ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পর দ্রুত স্থলপথে সোনা পাচারের পরিকল্পনা করছিল। এতে স্পষ্ট হয় যে, শুধু বিমানবন্দর নয়, বিমানবন্দরের বাইরের পরিবহন নেটওয়ার্কও চোরাচালান চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

চোরাচালানিরা কখনো টয়লেট প্যানেল, কখনো কার্গো হোল্ড, কখনো ফলের ক্রেট আবার কখনো গাড়িতে করে সোনা পাচারের চেষ্টা করছে। এছাড়া প্রবাসীদের ট্যাক্স ও কমিশন দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাগেজ রুলের সুযোগ নিয়ে সোনার বার আনা হচ্ছে। পায়ুপথে, জামার সুতার মধ্যে এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ভেতরেও সোনা আনার কৌশল ব্যবহারের তথ্য রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিমানবন্দরে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের এক শ্রেণির কর্মী অর্থের বিনিময়ে বড় চালান নিরাপদে বের করে দিতে সহায়তা করেন। অনেক সময় চোরাচালান চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে কোনো কোনো চালান ধরা পড়ে বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সোনা খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আকাশপথে দেশে আসা সোনার প্রায় ৯০ শতাংশই স্থলপথে ভারতে পাচার হয়ে যায়। মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহসহ ভারত সীমান্তঘেঁষা জেলাগুলো এই চোরাচালানের করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতে সোনার ওপর তুলনামূলক বেশি শুল্ক থাকায় বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ১০ গ্রাম সোনার শুল্ক মাত্র ১৫০ টাকা, বিপরীতে ভারতে তা প্রায় ৪ হাজার টাকা। যশোর সীমান্তকে দুবাই-ঢাকা-ভারত রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যশোরে ২০২৪ সালে ১৫১ কেজি, ২০২৫ সালে ৬৮ দশমিক ৫ কেজি এবং ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ২৪ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালে সীমান্ত এলাকা ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে বিজিবি ৬০ কেজির বেশি সোনা উদ্ধার করে। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, জব্দ হওয়া সোনার পরিমাণ প্রকৃত চোরাচালানের ১০ শতাংশেরও কম।

ঢাকার বিমানবন্দর থানায় সোনা চোরাচালানের অভিযোগে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ৫৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি মামলা হয়েছে। শুধু গত এক বছরে বিমানবন্দর থানায় ৯২টি মামলা হওয়া থেকে বোঝা যায়, চোরাচালানবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে এসব মামলার বেশিরভাগই বাহকদের বিরুদ্ধে, মূল পরিকল্পনাকারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলনামূলকভাবে কম।

সোনা খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাগেজ রুলের অপব্যবহার, শুল্কের ব্যবধান এবং অভ্যন্তরীণ সহায়তার কারণে দেশে সোনা চোরাচালান কমছে না। দেশে সোনার বার্ষিক চাহিদা ২০ থেকে ৪০ টন হলেও চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ সোনা শুল্কায়নের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে। ২০২২ সালে শুল্কায়নের মাধ্যমে অন্তত ৫৪ টন সোনা দেশে এসেছে, যার বাজারমূল্য ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সোনার বড় অংশই পরে স্থলপথে অন্য দেশে পাচার হয়ে গেছে। সোনা চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তা, রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ জুয়েলারী ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও বাজুসের মুখপাত্র আনোয়ার হোসেন বলেন, সোনা চোরাচালান রোধে বাজুস সরকারকে পদক্ষেপ নিতে অনেক আগে থেকেই বলে আসছে। আমরা চাই বাংলাদেশে অবৈধ পথে সোনা আসা কিংবা চালান হওয়া বন্ধ হোক। তাতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবে এবং সরকারও রাজস্ব হারাবে না। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জুয়েলারি শিল্প একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সোনার দামের অত্যধিক ওঠানামার কারণে সাধারণ ক্রেতারা গয়না কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। তার মধ্যে যদি অবৈধভাবে সোনা চোরাচালান ঘটতে থাকে, তাহলে সোনা খাতের ব্যবসায়ীরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বৈধ আমদানি থেকে যে রাজস্ব আসছে, তা চোরাচালানের তুলনায় নগণ্য। ব্যাগেজ রুল সংশোধন এবং স্ক্যানিং প্রযুক্তি আরও জোরদার করতে হবে। অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ভাঙতে সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন। একই সুরে বিজিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সীমান্তে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু মূল নেটওয়ার্ক আকাশপথে। বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে, নইলে শুধু বাহক ধরে সমস্যার সমাধান হবে না।

অর্থনীতিবিদ ও সোনাবাজার বিশ্লেষক ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে সোনার শুল্ক এত কম যে এটি আন্তর্জাতিক চোরাচালানিদের জন্য লোভনীয় হয়ে উঠেছে। ভারতে উচ্চ শুল্কের কারণে তারা বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রাজস্ব—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারকে অবিলম্বে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হবে এবং বিমানবন্দরে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।

সাবেক কাস্টমস কর্মকর্তা ও চোরাচালানবিরোধী অভিযানে অভিজ্ঞ আবদুল করিম বলেন, আমি দেখেছি কীভাবে সিভিল এভিয়েশন ও কাস্টমসের কিছু কর্মী অর্থের বিনিময়ে চালান পাস করে দেয়। প্রযুক্তিগত নজরদারি বাড়ালেও মানবিক সহায়তা বন্ধ না হলে সফলতা আসবে না। প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে চোরাচালান চলতেই থাকবে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাইফুল ইসলাম বলেন, সোনা চোরাচালান এখন জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু। এর মাধ্যমে অর্থ পাচার হচ্ছে, যা সন্ত্রাসী তৎপরতায় অর্থ সরবরাহ করতে পারে। বিমানবন্দর ও সীমান্তে সমন্বিত গোয়েন্দা-তথ্যভিত্তিক অভিযান জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান বাড়িয়ে সোনা চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যাগেজ রুল সংস্কার, শুল্ক কাঠামোর সমন্বয়, বিমানবন্দরে স্বয়ংক্রিয় স্ক্যানিং ব্যবস্থা জোরদার, অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময় বাড়ানো প্রয়োজন। চোরাচালানের এই নেটওয়ার্ক ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে প্রতিদিন বিপুল অর্থের অবৈধ সোনা দেশে প্রবেশ করে অর্থনীতি, রাজস্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করতে থাকবে।