রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের মূত্র পরীক্ষায় মাদকের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অথচ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘটনার রাতে তাদের ইয়াবা সেবনের কথা উল্লেখ রয়েছে। জবানবন্দিতে মাদক গ্রহণের কথা থাকার পরও পরীক্ষার ফল কেন নেগেটিভ বা নেতিবাচক এলো, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। ফরেনসিক বিজ্ঞানের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুটি তথ্যের মধ্যে আসলে কোনো সরাসরি বিরোধ নেই। এর মূল কারণ লুকিয়ে রয়েছে নমুনা সংগ্রহের সময়ের ব্যবধানে।
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়া এলাকায় গত ২০ আগস্ট দিবাগত রাতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। ২২ আগস্ট রাতে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ এবং পরদিন ২৩ আগস্ট ভোরে গ্রেপ্তার করা হয় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে। তবে তাঁদের মূত্রের নমুনা সংগ্রহ করা হয় ৩০ আগস্ট, যা হত্যাকাণ্ডের ঘটনার প্রায় ১০ দিন পর। পরদিন ৩১ আগস্ট রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এই পরীক্ষার প্রতিবেদন পায়, যেখানে দুজনের নমুনাই নেতিবাচক আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, মাদক নেওয়ার পর তা শরীরের সব নমুনায় সমান সময় ধরে থাকে না। মূত্রে যা কয়েক দিন পর আর পাওয়া যায় না, তা চুল বা নখে দীর্ঘ সময় পরও শনাক্ত করা সম্ভব।
ডোপ টেস্টের ফল ‘নেগেটিভ’ আসার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কখনো মাদক গ্রহণ করেননি। এর সহজ অর্থ হলো, যখন নমুনাটি পরীক্ষা করা হয়েছে, তখন শরীরে মাদক বা তার থেকে তৈরি হওয়া উপাদান শনাক্ত করার মতো ন্যূনতম পরিমাণ অবশিষ্ট ছিল না। বাংলাদেশের ‘জৈব নমুনায় মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) বিধিমালা, ২০২৬’-এ বিষয়টিকে ‘মিথ্যা নেতিবাচক’ বা ফলস নেগেটিভ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি মাদক নেওয়ার পরও যদি তাঁর জৈব নমুনায় মাদকের বিপাকজাত পদার্থ পরীক্ষাগারের নির্ধারিত মাত্রার নিচে থাকে, তবে ফল নেতিবাচক আসতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি ডোপ টেস্টের ফল ব্যাখ্যা করতে মূলত চারটি বিষয় জানা জরুরি: কোন মাদক নেওয়া হয়েছিল, কত দিন আগে নেওয়া হয়েছিল, কী ধরনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং পরীক্ষার শনাক্ত সীমা কত ছিল।
ইয়াবার প্রধান উপাদান মেথামফেটামিন সাধারণত মূত্রে দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়। তবে নিয়মিত সেবন, শরীরের বিপাকক্রিয়া, মূত্রের অম্ল-ক্ষার মাত্রা এবং পরীক্ষাপদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে এই সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে। রংপুর মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ রাশিদুল হক জানান, প্রায় ১০ দিন পর মূত্রের নমুনা পরীক্ষা করায় মেথামফেটামিন না পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। ফলে ৩০ আগস্টের পরীক্ষায় মাদক না পাওয়ার অর্থ এই নয় যে, ২০ আগস্ট রাতে আসামিরা ইয়াবা সেবন করেননি।
মূত্র: কয়েক দিন আগের মাদক সেবন শনাক্ত করতে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। একবার মাদক গ্রহণের পর মূত্রে অধিকাংশ মাদক সাধারণত দেড় থেকে চার দিন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে সেবনকারীদের ক্ষেত্রে কিছু মাদক এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় পরও ধরা পড়তে পারে।রক্ত: মাদক নেওয়ার সঙ্গে সময়ের সঠিক সম্পর্ক বুঝতে রক্ত পরীক্ষা বেশি কার্যকর। রক্ত বা রক্তরসে অধিকাংশ মাদক সাধারণত এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়।লালা: খুব সাম্প্রতিক সময়ে মাদক গ্রহণ করা হয়েছে কি না, তা জানতে লালা পরীক্ষা করা হয়। সাধারণত বিভিন্ন মাদক লালায় ৫ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব।চুল: মূত্র, রক্ত বা লালার চেয়ে অনেক দীর্ঘ সময়ের মাদক ব্যবহারের ইতিহাস চুলে পাওয়া যায়। সাধারণত মাদক নেওয়ার এক সপ্তাহ পর থেকে কয়েক মাস আগের ইতিহাস জানতে চুলের নমুনা কার্যকর। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের মাদক সেবন চুলে ধরা পড়ে না।নখ: চুলের মতো নখও দীর্ঘমেয়াদি মাদক ব্যবহারের তথ্য দিতে পারে। গবেষণায় মাদক গ্রহণের তিন থেকে ছয় মাস পরও নখে মাদকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, তবে এর সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনো আন্তর্জাতিকভাবে পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয়।ডোপ টেস্ট নিয়ে বিভ্রান্তির আরেকটি বড় কারণ হলো, সব মাদক শরীর থেকে একই গতিতে বের হয় না। যেমন মেথামফেটামিন মূত্রে কয়েক দিন থাকে, কিন্তু দীর্ঘদিন গাঁজা সেবনকারীদের ক্ষেত্রে গাঁজার প্রধান উপাদান টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনলের (টিএইচসি) বিপাকজাত পদার্থ মূত্রে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্ত হতে পারে। আবার কিছু মাদকের উপাদান মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শরীর থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এছাড়া একটি ডোপ টেস্ট দিয়ে সব মাদকের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায় না। বিধিমালা অনুযায়ী, প্রাথমিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে অপিওয়েডস, মেথামফেটামিন, ক্যানাবিনয়েডস, বেনজোডায়াজেপিন ও অ্যালকোহল পরীক্ষার জন্য আলাদা ঘর থাকে।
ডোপ টেস্টের প্রক্রিয়াটি সাধারণত দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়—প্রাথমিক শনাক্তকরণ পরীক্ষা এবং নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা। প্রাথমিক পরীক্ষায় কিট বা ফিতা ব্যবহার করে ফল ইতিবাচক এলে, তা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উন্নত পদ্ধতিতে পুনরায় পরীক্ষা করতে হয়। নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ম রয়েছে। যেমন রক্তের নমুনা নেওয়ার আগে ব্যক্তিকে ২০ মিনিট বিশ্রামে রাখতে হয় এবং ৫ থেকে ১০ মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহ করতে হয়। লালা নেওয়ার অন্তত ৩০ মিনিট আগে থেকে খাবার ও পানীয় গ্রহণ বন্ধ রাখতে হয়। চুলের ক্ষেত্রে মাথা বা শরীরের অন্য অংশ থেকে অন্তত ১০টি চুল সংগ্রহ করে সিল করতে হয় এবং নখের ক্ষেত্রে হাত ও পায়ের নখের অংশ নিয়ে দুটি নমুনা নিতে হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ২৪ ধারা অনুযায়ী সরকার চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ‘জৈব নমুনায় মাদকদ্রব্য শনাক্তকরণ পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করে। তবে এই বিধিমালা বাস্তবায়নে এখনো পরীক্ষাগারের সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) উপপরিচালক মানজুরুল ইসলাম। তিনি জানান, বর্তমানে অধিদপ্তরের নিজস্ব পরীক্ষাগারে মূলত মূত্র ও রক্তের প্রাথমিক পরীক্ষা করা হয়। প্রাথমিক ফল ইতিবাচক হলে গ্যাস ক্রোমাটোগ্রাফি-ম্যাস স্পেকট্রোমেট্রি অথবা উচ্চ কার্যক্ষম তরল ক্রোমাটোগ্রাফির মাধ্যমে নিশ্চিতকরণ পরীক্ষা করা হয়। তবে চুল ও নখের পূর্ণাঙ্গ ডোপ টেস্টের সক্ষমতা এখনো তাদের তৈরি হয়নি, যা নিয়ে কাজ চলছে। রংপুর মেডিকেল কলেজের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ রাশিদুল হকও নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁদের হাসপাতালেও কেবল মূত্র পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে, চুলের নমুনা পরীক্ষার কোনো সুযোগ নেই। রংপুরের এই হত্যাকাণ্ড ও আসামিদের নেতিবাচক ডোপ টেস্টের ঘটনাটি মূলত অপরাধ তদন্তে দ্রুততম সময়ে সঠিক নমুনা সংগ্রহের গুরুত্ব ও ডোপ টেস্টের সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
মূত্রে যা কয়েক দিন পর আর পাওয়া না–ও যেতে পারে, চুল বা নখের নমুনায় সেটি আরও দীর্ঘ সময় পরও ধরা পড়তে পারে।.ডোপ টেস্টে ১১৬ মাদকাসক্ত পুলিশ চাকরিচ্যুত.ডোপ টেস্টে ফল ‘নেগেটিভ’ হওয়ার অর্থ সব সময় এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কখনো মাদক নেননি।