সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিভেদ ও বিরোধ তৈরি হলে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তি আবারও মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এই সতর্কবার্তা দেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে এ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এবং গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে পাখির মতো গুলি করে প্রায় ১৪০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং ৩০ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বা অন্ধত্ব বরণ করেছেন। সুশাসন ও ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই শহীদদের ঋণ শোধ করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। তিনি সরকারি ও বিরোধী দল নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তোলার তাগিদ দিয়ে বলেন, সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।
দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচির সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, লংমার্চ করে যদি এই সমস্যার সমাধান করা যেত, তবে সরকারই সবার আগে তা করত। বিরোধী দলের কাছ থেকে সহযোগিতার আশা করলেও লংমার্চের নামে জনগণকে অযথা উত্তেজিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে কিনা, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তারেক রহমান দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, দেশকে সংকট থেকে মুক্ত করেছে। এবারও সময়ের ব্যবধানে এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
জ্বালানি সংকটের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি জানান, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশীয় উৎস বা বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, বরং দেশকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হওয়ায় গ্যাস আমদানি ব্যাহত হয় এবং একটি এফএসআরইউ (এলএনজি টার্মিনাল) দুর্ঘটনায় বিকল হওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়। তবে সরকার বসে নেই; বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদকে রূপান্তরের পরিকল্পনাসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ইতিহাসের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি সংকটে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি হাল ধরে সফল হয়েছে। জিয়াউর রহমান তলাবিহীন ঝুড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে দেশকে খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছিলেন। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া নারী শিক্ষায় বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন এবং দুই কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালেও বিএনপি দেশকে দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে মুক্ত করেছিল।
দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ঋণের বোঝা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকার খেলাপি ঋণের ভুল তথ্য দিয়েছিল। ২০২৪ সালে তারা খেলাপি ঋণ দেখিয়েছিল ১১ শতাংশ, কিন্তু ফরেনসিক অডিটে দেখা গেছে প্রকৃত খেলাপি ঋণ ছিল ৩৫.৫ শতাংশ। সরকারের পদক্ষেপের ফলে গত ৫ মাসে তা কমে ৩২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া, যারা দেশকে ঋণের সাগরে ডুবিয়ে পালিয়েছেন, তাদের রেখে যাওয়া বোঝা টানতে বর্তমান সরকার গত ৫ মাসে রেকর্ড ২ হাজার ৪৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করেছে।
সবশেষে দেশে অবারিত বাকস্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে শালীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি রাজনীতি থেকে গালাগালির সংস্কৃতি পরিহারের তাগিদ দিয়ে বলেন, পারিবারিক পরিবেশে যে শব্দগুলো ব্যবহার করতে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না, জনপ্রতিনিধি হয়েও কেন আমরা সেই শব্দগুলো জনপরিসরে ব্যবহার করব? একটি রুচিশীল সমাজ গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।