চট্টগ্রাম অভিমুখে গত ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত লংমার্চের মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট কি সরকারকে বড় আন্দোলনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে যাচ্ছে—এমন প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে।
কর্মসূচির প্রথম দিনেই জোটের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, লংমার্চে বাধা সৃষ্টি করলে কিংবা তাদের দাবি পূরণ না হলে বর্তমান সরকার পতনের একদফা আন্দোলন শুরু করা হবে।
ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রাথমিক সমাবেশে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন, সরকার বাধা দিলে তাদের ‘ছয় দফা এক দফায় রূপ নেবে’। অন্যদিকে, লংমার্চের সমাপ্তিস্থল চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানের সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান সরকারকে সতর্ক করে বলেন, বিরোধী দলের এই আন্দোলন ‘ঈদের পরের আন্দোলন’ হবে না।
বিরোধী জোটের এমন কর্মসূচির দিনে ও তার পরদিনই সরকারের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে। লংমার্চের দিনই ঢাকায় বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেন, দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে একটি অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে।
তবে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে দেশের আইনেই তা নিয়ন্ত্রণের পথ বাতলে দেওয়া আছে। এর পরদিন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদও বিরোধী দলের এই কর্মসূচির কঠোর সমালোচনা করেন।
বিএনপির পক্ষ থেকে এই আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, কারণ বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ছয় মাস পার করেছে। এত দ্রুত এমন বড় কর্মসূচিকে ঘিরে সম্ভাব্য অস্থিরতা তৈরির তথ্য রয়েছে বলে মনে করছে দলটি। রুহুল কবির রিজভী মনে করেন, গণভোটসহ বিভিন্ন বিষয়ে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক ধরনের প্রতারণা করে গেছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরের অব্যবস্থাপনার দায় বিএনপির নয়, কিন্তু জামায়াত সেই দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে এই লংমার্চ কর্মসূচি পালন করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে মূলত ছয়টি দাবি তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাসের সংকট নিরসন, দুর্নীতি ও দলীয়করণ বন্ধ করা এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন।
এই দাবিগুলো নিয়ে জোটের কর্মসূচি কেবল চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাদের ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে পরবর্তী লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।
এরপর ১০ অক্টোবর খুলনায় এবং ২৪ অক্টোবর সিলেটে লংমার্চ করা হবে। বিভাগীয় শহরের এই চারটি লংমার্চ শেষে আগামী নভেম্বর মাসে ঢাকায় একটি মহাসমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে, যেখান থেকে পরবর্তী বড় ধরনের আন্দোলনের ঘোষণা আসতে পারে。
সরকারের মাত্র ashes মাসের মাথায় কেন এমন ধারাবাহিক আন্দোলনে নামতে হলো, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, পরিস্থিতিই তাদের আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডারে দুটি বাধ্যতামূলক সময়সীমা ছিল।
প্রথমত, সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার কথা থাকলেও তা ডাকা হয়নি। দ্বিতীয়ত, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন করে সংবিধানে তফশিল অন্তর্ভুক্ত করার ছয় মাসের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, সরকার গণভোটের রায় বা জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না করে নিজেদের ইচ্ছেমতো দেশ চালাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, নির্বাচনে ৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সরকার যদি গণভোটের প্রায় ৭০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায়কে অমান্য করে, তবে তা জনগণ মেনে নেবে না।
আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এতগুলো প্রাণের বিনিময়ে যে গণআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তাকে অস্বীকার করার চেয়ে বড় ক্ষতি আর কিছু হতে পারে না। ফলে মাত্র ছয় মাসের দোহাই দিয়ে এই আন্দোলনকে অযৌক্তিক বলা চলে না।